শ্রমিকদের স্বার্থে আইএলওর তিন কনভেনশনে সই করছে সরকার
ফখরুল ইসলাম, ঢাকা।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও)।
বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কনভেনশন একসঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসমর্থন করতে যাচ্ছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় মনে করছে, এই উদ্যোগের ফলে শ্রমিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হবে এবং কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানি কমবে।
অনুসমর্থন হতে যাওয়া কনভেনশনসমূহ
অন্তর্বর্তী সরকারের এই উদ্যোগে বাংলাদেশ যে তিনটি কনভেনশন অনুসমর্থন করতে যাচ্ছে, তার মধ্যে দুটি আইএলওর মৌলিক কনভেনশন (২০২২ সালে স্বীকৃত):
১. ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের চিত্র (জুলাই-আগস্ট, চলতি অর্থবছর)
- গৃহীত ঋণ (অর্থছাড়): চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে সব মিলিয়ে মোট ১৬ কোটি ৬ লাখ ডলার ঋণ এসেছে।
- ঋণের প্রকৃতি: এই পুরো টাকাই ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
- পরিশোধিত ঋণের পরিমাণ: জুলাই-আগস্ট মাসে পরিশোধিত ঋণের (সুদাসল) পরিমাণ ছিল ৬৬ কোটি ৭১ লাখ ডলার।
- আসলের পরিমাণ: পরিশোধ করা ৬৬ কোটি ৭১ লাখ ডলারের মধ্যে ৪৬ কোটি ৫৭ লাখ ডলার ছিল আসল।
- তুলনা: গত বছরের একই সময়ে এসেছিল প্রায় ৪৬ কোটি ডলার।
২. আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশনসমূহের বিবরণ
- কনভেনশন নম্বর ১৫৫: এই কনভেনশনের বিষয়বস্তু হলো পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা (OS&H)।
- কনভেনশন নম্বর ১৮৭: এই কনভেনশনের বিষয়বস্তু হলো কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার মান উন্নয়নে প্রচারণামূলক কাঠামো (OS&H)।
- কনভেনশন নম্বর ১৯০: এই কনভেনশনের বিষয়বস্তু হলো কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধ।
অনুসমর্থনের প্রক্রিয়া ও সময়সীমা
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে গত ২৪ জুলাই উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই তিন কনভেনশনে অনুসমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই মাসেই কনভেনশনগুলো স্বাক্ষরের কথা রয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার উপস্থিতিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন কনভেনশনগুলোতে সই করবেন। এরপর তিনি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আইএলওর প্রধান কার্যালয়ে সংস্থাটির মহাপরিচালক গিলবার্ট এফ হাউংবোর কাছে অনুসমর্থনের প্রমাণপত্র তুলে দেবেন।
শ্রমসচিব মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া জানান, শিগগিরই এই কনভেনশনগুলো অনুসমর্থন করা হবে, যা বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বাড়াবে।
মালিকপক্ষের আপত্তি ও বিশেষজ্ঞদের মত
সরকারের এই উদ্যোগকে অধিকারভিত্তিক সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) স্বাগত জানিয়েছে। ব্লাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন মনে করেন, এর ফলে শ্রমিকের নিরাপত্তা অধিকারের পরিধি নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে এবং অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের প্রতিকার পাওয়া সহজ হবে। তবে এগুলো বাস্তবায়নে সরকারকে আইন প্রণয়ন বা সংশোধনে মনোযোগী হতে হবে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এই উদ্যোগের বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, অস্থির সময়ে সরকার কেন স্বপ্রণোদিত হয়ে এসব কনভেনশন অনুসমর্থন করছে, তা তারা বুঝতে পারছেন না। তিনি যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো দেশও কনভেনশন ১৯০ অনুসমর্থন করেনি, তাই জাতীয় স্বার্থে সরকারের এই উদ্যোগ থেকে সরে আসা উচিত।
শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ মালিকপক্ষের আপত্তির জবাবে বলেন, যেসব দেশে রানা প্লাজা বা তাজরীন ফ্যাশনসের মতো ট্র্যাজেডি ঘটেনি, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। তিনি মনে করেন, এই তিন কনভেনশন অনুসমর্থন করলে শুধু শ্রমিক নন, শিল্পকারখানার মালিকদেরও দায়বদ্ধতা বাড়বে এবং তাঁরাই চূড়ান্ত অর্থে লাভবান হবেন।
