রাষ্ট্রীয় পরীক্ষায় জালিয়াতি, বিনা NOC তে বিদেশ ভ্রমণ, সুস্থ রোগীর অন্ত্র চুরি! কর্তৃপক্ষ নির্বিকার!

শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

‘কষ্ট পাবেন’ তাই চোখ- কান বন্ধ করে আছেন প্রতিষ্ঠাতারা

সিবিএমসিবি-এর আজকের এই চরম সংকটাপন্ন অবস্থা এবং কসাইখানায় পরিণত হওয়ার পেছনে গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান ডা. মান্নান সাহেব এবং মেম্বার সেক্রেটারি মাহফুজ সাহেবের কোনোই হাত নেই— অন্তত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র এমনটাই নিশ্চিত করেছেন! যদি তারা জড়িত না-ই থাকেন, তবে চোখের সামনে এমন হরিলুট আর অপরাধের স্বর্গরাজ্য তারা কেন প্রশ্রয় দিচ্ছেন? কেনই বা নিচ্ছেন না কোনো দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা?

এমন পাল্টা প্রশ্নের জবাবে কলেজটির পিআরও এবং প্রিন্সিপালের পিএস-এর মতো সাধারণ চাকরিজীবীরা যা শোনালেন, তা রীতিমতো করুণ রসে ভরপুর! তাদের আবেগঘন ভাষ্য—

“স্যাররা ফাউন্ডিং মেম্বার, ১৯৯৫ সাল থেকে আজ ৩১ বছর ধরে তারা এই প্রতিষ্ঠানটি নিজ সন্তানের মতো মাতৃস্নেহে আগলে রেখেছেন। কলেজের এহেন অবক্ষয় আর দুর্নীতির সংবাদ তাদের জানালে তারা বড়ই কষ্ট পাবেন, কিছুতেই মেনে নিতে পারবেন না!”

আহা, কী অদ্ভুত সমবেদনা! স্যারদের কোমল হৃদয়ে যাতে কোনো আঘাত না লাগে, তাই আমরাও তাদের পিএস-দের আশ্বস্ত করেছি— চিন্তার কিছু নেই, ফাউন্ডিং মেম্বারদের বিষয়ে আমরা আপাতত কিছুই‘ফাইন্ডিংস’ করব না!

মাদার অব মাফিয়া’র পলায়ন ও লেজকাটা শেয়ালের দল!

এই সিন্ডিকেটের লজ্জাহীনতার উৎস আসলে কোথায়? অনুসন্ধানে কেঁচো খুঁড়তে কুমির পাওয়া গেল! স্বাস্থ্যখাতের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার এক দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছে যখন জানতে চাওয়া হলো—“অকাট্য প্রমাণের পরও আপনারা কেন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না?” তিনি চারপাশে তাকিয়ে গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ভাই, মাদার অব মাফিয়াই তো লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে! আর দেশে তাদের ফেলে যাওয়া অবৈধ সন্তানরা আজও বুঝতে পারছে না যে, তাদেরও পালানোর সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।” এরপর যখন অবাক হয়ে প্রশ্ন করা হলো, “তাহলে এদের লেজ কেউ ধরতে পারছে না কেন?” তখন রীতিমতো দাঁত বের করে হেসে তিনি যা শোনালেন, তা দেশের পুরো স্বাস্থ্যখাতের পচনশীল চেহারার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।তার সোজাসাপ্টা জবাব, “ভাই, অবৈধ টাকাগুলো থেকে কিছু তো নিতে দেন স্যারদের! আর লেজ ছুঁবে কীভাবে? শেয়ালগুলো তো আগেই নিজেদের লেজ কেটে এই অঙ্গ চুরি সিন্ডিকেটের সদস্যপদ নিয়ে ছিল!” অর্থাৎ, টাকার ভাগ তো উপর মহল পর্যন্তও যাচ্ছে, তাই লেজ কাটা শেয়ালের দলে সবাই মিলেমিশে চোখ বন্ধ করে আছে।

অদৃশ্য দেয়াল ও তদন্তের নামে প্রহসন

কোথায় অভিযোগ দেওয়া হয়নি এদের বিরুদ্ধে? বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BM&DC), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক— প্রতিটি দপ্তরে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ, অডিও রেকর্ডসহ অভিযোগ জমা পড়েছে। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, অভিযোগগুলো যেন কোনো এক পেটিকোটের পকেটে ঢুকে যাচ্ছে। এক কালা জাদুর ইশারায় সব তদন্তের চাকা থেমে যায়। তদন্ত তো দূরের কথা, একটা সাধারণ শোকজ নোটিশ দেওয়ার সাহসও যেন হারিয়ে ফেলেছে দেশের স্বাস্থ্যখাতের তদারকি সংস্থাগুলো!

রক্ষক যখন ভক্ষকের পাহারাদার

সিবিএমসিবি-এর প্রশাসন এই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। প্যাথলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. নাজমা পারভীন (পলাশ) যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেশনাল পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ফেলে কোনো অনুমতি ছাড়াই বিদেশে প্রমোদভ্রমণে যান, তখন তাকে আড়াল করতে ঢাল হয়ে দাঁড়ায় খোদ কলেজ প্রশাসন।

সার্জন ডা. তৌফিকুল হক নিরীহ রোগী রমজান মিয়ার পেট কেটে জীবন বিপন্ন করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বরং, নিজেদের পিঠ বাঁচাতে হাসপাতালের অফিশিয়াল রেকর্ড এবং প্যাথলজির ব্লক টেম্পারিং করার মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে প্রকাশ্যেই।

চোরের মায়ের বড় গলা: অপরাধীর বদলে খোঁজা হচ্ছে অভিযোগকারীকে!

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই সিন্ডিকেট এতটাই বেপরোয়া যে তারা নিজেদের শোধরাতে রাজি নয়, বরং সত্য প্রকাশকারীদের কণ্ঠরোধ করতে মরিয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি কন্ট্রোলার, যাঁর দায়িত্ব ছিল এই জালিয়াতির তদন্ত করা, তিনি মূল অপরাধীদের বাদ দিয়ে উল্টো অভিযোগকারীকে খুঁজতে ব্যস্ত! অন্যদিকে, সিবিএমসিবি’র অধ্যক্ষ স্বয়ং ‘হাসিম’ নামের এক অভিযোগকারীর সন্ধানে মাঠে নেমেছেন।

অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার বদলে, যারা দুর্নীতির মুখোশ খুলে দিচ্ছে তাদের চরিত্রহনন এবং হুমকি দেওয়ার এই নির্লজ্জ আস্ফালন প্রমাণ করে— স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহিতার কফিনে শেষ পেরেকটি তারা ঠুকে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক নজরদারি বনাম দেশীয় নিরবতা

স্থানীয় প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যখন টাকার পাহাড় আর ক্ষমতার কাছে অন্ধ, তখন বাধ্য হয়ে এই দুর্নীতির পুরো ডসিয়ার (Dossier), অডিও প্রমাণ এবং জালিয়াতির মেডিকেল রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ফেইমার (FAIMER)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থায়। ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা হয়েছে সাধারণ ডায়েরিও (GD)।

শেষ কোথায়?

দৈনিক জাহানের পাঠকরা আজ জেগেছেন। গুগল সার্চে এই খবর আজ দেশের এক নম্বর ট্রেন্ডিং। মানুষ জানতে চায়— সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এই কসাইদের রাজত্ব কবে শেষ হবে? রাষ্ট্রের আইন কি শুধু সাধারণ মানুষের জন্য, আর সিবিএমসিবি’র এই মাফিয়াদের জন্য কি সবকিছুই মাফ?

তদন্তকারী সংস্থাগুলো যদি এখনো ঘুমিয়ে থাকে, তবে জনগণের কাঠগড়ায় তাদেরও একদিন দাঁড়াতে হবে। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি এভাবেই চলতে দেওয়া যায় না।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *