মোশাররফ হোসেন মুসা

মানুষ নিকটবর্তী ঘটনাকে বিবেচনা করে বেশি। সরকারের স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডে জনগণের জীবন-যাপনে সরাসরি আঘাত হানে। কখনো কখনো তাদের অস্তিত্ব বিলোপের মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়। দূরবর্তী ঘটনা তাদের স্মৃতিতে আবছা বা ঝাপসা হয়ে যায়। মস্তিষ্কের স্মৃতিধারণের সীমাবদ্ধতা ও নতুন তথ্য সংযোগের কারণে তারা পুরাতন ঘটনাকে গুরুত্ব দিতে চায় না।
বিএনপির ধৈর্য ও নেতৃত্বের দক্ষতা
বিএনপি প্রায় ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল এবং বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তারা রাজপথে ছিল। আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর অন্তবর্তীকালীন সরকার সংস্কারের নামে নির্বাচন পেছানোর নানারকম চেষ্টা করে। এমনকি দলটির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানকে দেশে ফিরতে নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করে। কিন্তু বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতারা অসীম ধৈর্য সহকারে সকল ষড়যন্ত্রকে মোকাবেলা করে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। অবশেষে ১২ ফেব্রয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ধার্য্য হয়েছে।
তারেক রহমান: নতুন প্রজন্মের আইকন
নতুন প্রজন্ম পুরোনো ধারার রাজনীতির পরিবর্তন চায়। উন্নত কিংবা অনুন্নত দেশের রাজনীতি এখনো কম-বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। তাদের কাছে তারেক রহমান এখন আইকোনিক ফিগার তথা সময়ের প্রতীক। সেজন্য নতুন প্রজন্ম এবং যেসকল তরুণ বিগত সরকারের সময়ে ভোট দিতে পারে নি, এবার তারা বিএনপিকে ভোট দিতে আগ্রহী।
আন্দোলনের ত্যাগ ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য
২০২৪ সালে আওয়ামীলীগের ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে বিএনপি’র ৪২২ জন নেতা-কর্মী নিহত হন। তন্মধ্যে ছাত্রদলের সদস্য রয়েছেন ১৪৩ জন। তাছাড়া শতাধিক নেতা-কর্মী গুমের শিকার হন। বিএনপি’র আন্দোলনে গোপন কোনো নকসা ছিল না। তারা বরাবরই একটি দাবির উপর নির্দিষ্ট ছিল, তা হলো- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। তারা তথাকথিত বিপ্লবী সরকার গঠনের কথা বলেন নি। যেহেতু বিপ্লব করতে হলে একটি বিপ্লবী দল থাকতে হয় এবং সেসঙ্গে নির্দিষ্ট রূপরেখা থাকতে হয়। তারেক রহমান মধ্যপন্থা অবস্থান নিয়ে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।
ইশতেহার ও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’
গত ৬ ফেব্রয়ারি সোনারগাঁও হোটেলে বিএনপি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৫১টি বিষয় বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিএনপি সবচেয়ে অগ্রাধিকার দিয়েছে দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা। দলটির ইস্তেহারে গণতান্ত্রিক সংস্কার, অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন, সামাজিক নিরাপত্তা বিধান, নারীর ক্ষমতায়ন, পররাষ্ট্র নীতি, জাতীয় ঐক্য (বিভাজন দুর করতে দক্ষিণ আফ্রিকার আলোকে ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন গঠন)। সববেশে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। মানুষ চিন্তার সমান বড়। সেক্ষেত্রে তারেক রহমান উচ্চমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন।
প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ও বিতর্ক
অন্যদিকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী কট্টর পন্থা থেকে সরে এসে বলেছে- তারা ক্ষমতায় গেলে শরিয়া আইন প্রবর্তন করবে না। এটা তাদের নীতি না কৌশল, বুঝা মুশকিল। মাঝেমধ্যে বেফাস কথা বলে তারা আসল রূপ প্রকাশ করে ফেলেন। যেমন, ঢাকা-১৭ আসনে প্রার্থী হয়েছেন ডা. খালিদুজ্জামান। এই আসনে তারেক রহমানও প্রার্থী হয়েছেন। সম্প্রতি তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় গানম্যানসহ প্রবেশ করতে গেলে সেনা প্রহরীরা বাধা দেন। এতে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে সেনাবাহিনী সম্পর্কে যেরকম কুরুচিপূর্ণ ভাষা উচ্চারণ করেছেন, তা কোনো সজ্জন ব্যক্তি করতে পারেন না। তাছাড়া দলের আমীর ডা. শফিকুর রহমান কর্মজীবী নারীদের পতিতাদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এর আগে আমীর হামজা ও বরগুনার এক জামায়াত নেতা জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে অত্যন্ত বাজে মন্তব্য করেছেন। মানুষের চিন্তা করার ও কর্ম করার হাজার রকম ক্ষেত্র থাকার পরেও তারা কেন নারীদেহ নিয়ে পড়ে আছেন – তা রীতিমতো গবেষণার বিষয়।
জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশল ও বৈপরীত্য
মজার বিষয় হলো- তারা নারীদের নিয়ে কুকথা বললেও তারা নারীদের ভোটে জয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। তাদের কথা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিতর্ক শুরু হলে তারা তৎক্ষনাৎ সেটা অস্বীকার করেন। পত্রিকা সুত্রে জানা গেছে, রোনাল্ড ট্রাম্প গড়ে প্রতিদিন ১৮টি মিথ্যা কথা বলেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তারা মিথ্যা কথায় ট্রাম্পকেও ছাড়িয়ে গেছেন। তাদের কৌশল ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জয়ী হওয়া আগে দরকার। কিন্তু জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিবির থেকে জয়ী হওয়া ভিপি ও ৯ জন সদস্য সম্প্রতি বিএনপিতে যোগদান করায় তাদের দুরভিসন্ধি কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তরুণ প্রজন্মের আস্থার স্থল
গত ৬ ফেব্রয়ারি হাদি হত্যার বিচার চেয়ে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ যেসব শ্লোগান দিয়েছে, তাতে প্রমাণীত হয় তারা কোনোক্রমেই নির্বাচন চায় না। এছাড়া জুলাই আন্দোলনের নেতৃবৃন্দও বহুধাবিভক্ত। তাদের কর্মকাণ্ডে সচেতন তরুণ গোষ্ঠী বীতশ্রদ্ধ। সবদিক বিবেচনা করে বলা যায়, নতুন প্রজন্ম বিএনপি’র উপর ভরসা রাখছে বেশি।





