মনজুরুল হক, শেরপুর প্রতিনিধি

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত বারোমারী সাধু লিও’র খ্রিস্টধর্মপল্লীতে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী ‘ফাতেমা রাণীর’ তীর্থোৎসব।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর ২০২৬) বিকেলে পবিত্র খ্রিস্টযাগ ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে এ উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর ২০২৬) বেলা সাড়ে ১১টায় মহাখ্রিস্টযাগের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে এ ধর্মীয় আয়োজনের।
তীর্থোৎসবকে কেন্দ্র করে বারোমারী ও আশপাশের পাহাড়ি জনপদে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খ্রিস্টধর্মাবলম্বী ভক্তরা ইতোমধ্যে তীর্থপল্লীতে সমবেত হয়েছেন। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এবারও প্রায় অর্ধলক্ষাধিক তীর্থযাত্রীর সমাগম ঘটবে।
ধর্মীয় আচার ও কর্মসূচি
প্রতি বছর অক্টোবর মাসের শেষ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এই বার্ষিক তীর্থোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। শেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি বিদেশ থেকেও খ্রিস্টভক্তরা এতে অংশ নেন। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে মা মারিয়ার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা নিবেদন করতে তীর্থযাত্রীরা সমবেত হন।
আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দিন বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় পবিত্র খ্রিস্টযাগের মধ্য দিয়ে উৎসবের কার্যক্রম শুরু হয়। সন্ধ্যায় আলোর শোভাযাত্রা, মহাখ্রিস্টযাগ, পাপস্বীকার ও নিশি জাগরণসহ নানা ধর্মীয় কর্মসূচি সম্পন্ন হয়। শুক্রবার সকালে জীবন্ত ক্রুশের পথসহ অন্যান্য ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে মহাখ্রিস্টযাগের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে। এবারের আয়োজনে প্রধান পুরোহিত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ময়মনসিংহ খ্রিস্টধর্মপ্রদেশের বিশপ পনেন পৌল কুবি, সিএসসি।
মেলা ও ভক্তদের অনুভূতি
তীর্থযাত্রীদের সুবিধার্থে থাকা ও খাওয়ার সুব্যবস্থা করেছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি তীর্থপল্লী সংলগ্ন মাঠে বসেছে নানা পণ্যের মেলা। মেলায় খ্রিস্টধর্মীয় সামগ্রী, গারো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, চুড়ি-মালা, গৃহস্থালি সামগ্রী, শোপিস ও শিশুদের খেলনাসহ নানা পণ্য বিক্রি হচ্ছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ মেলায় ভিড় করছেন।
টাঙ্গাইলের মধুপুর থেকে আসা তীর্থযাত্রী বিপন সংমা অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “এই তীর্থস্থানে এসে আমার খুব ভালো লাগছে। ফাতেমা রাণী মা মারিয়ার চরণে ভক্তি-শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি। তিনি নিশ্চয় আমাদের ওপর সদয় হবেন।”
তীর্থোৎসব আয়োজক কমিটির সমন্বয়ক ও বারোমারী খ্রিস্টান মিশনের পালপুরোহিত রেভারেন্ড ফাদার তরুণ বনোয়ারী জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় শান্তিপূর্ণ ও আধ্যাত্মিক পরিবেশে অনুষ্ঠান পালিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো ভক্ত এসে সমবেত হয়েছেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ধর্মপল্লীর ইতিহাস
উৎসব ঘিরে নিটোল নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন। শেরপুরের পুলিশ সুপার মো. জহিরুল ইসলাম জানান, উৎসব ঘিরে পোশাকধারী ও সাদা পোশাকে প্রায় চার শতাধিক পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। পুরো এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরা ও গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৪২ সালে প্রায় ৪২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় বারোমারী সাধু লিও’র খ্রিস্টধর্মপল্লী। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সাল থেকে স্থানটি বার্ষিক তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিতি পায়। পর্তুগালের ফাতেমা নগরীর আদলে গড়ে তোলা এ ধর্মপল্লীতে রয়েছে ৪৮ ফুট উচ্চতার মা মারিয়ার দৃষ্টিনন্দন ও বিশাল মূর্তি।