ডিলার জিম্মি করে কোটি টাকার বাণিজ্য: সামান্য অপারেটরের হাতে খাদ্য অফিসের নিয়ন্ত্রণ

​স্টাফ রিপোর্টার, ময়মনসিংহ

নিয়োগবিধি অনুযায়ী তিনি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন তৃতীয় শ্রেণির একজন সাধারণ কর্মচারী কম্পিউটার অপারেটর। নাম জাকির হোসেন। তবে ময়মনসিংহের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে দাপ্তরিক পরিচয় ছাপিয়ে কার্যক্ষেত্রে তিনি এখন অলিখিত ‘ছায়া নিয়ন্ত্রক’।

​ডিলারদের ফাইল অনুমোদন, মাস্টাররোল প্রস্তুত এবং খাদ্যগুদামের ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) প্রক্রিয়াকরণকে জিম্মি করে তিনি গড়ে তুলেছেন বেপরোয়া ঘুষের সিন্ডিকেট। প্রতিদিন অফিসে ঢোকা এবং বের হওয়ার পথেই বিভিন্ন খাদ্য ডিলারের পকেট কেটে তাঁর হাতে উঠছে অন্তত ৩০ হাজার টাকা। সেই হিসাবে মাসে প্রায় ৯ লাখ আর বছরে এই অবৈধ আয়ের অঙ্ক ছাড়িয়ে যাচ্ছে ১ কোটি ৯ লাখ টাকা।

​ওএমএস, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং নিয়মিত খাদ্যশস্য ডিলারদের অভিযোগ, জাকির হোসেনকে এই নির্ধারিত বখরা না দিলে নথিপত্রে ইচ্ছাকৃত ভুল ও কাটাকাটি তৈরি করে বরাদ্দ আটকে রাখা হয়। এমনকি এলএসডি (স্থানীয় সরবরাহ ডিপো) বা গুদাম থেকে ভালো মানের চাল-গম বরাদ্দের বদলে ধরিয়ে দেওয়া হয় পচা ও নিম্নমানের খাদ্যশস্য। লোকসান ও নানামুখী প্রশাসনিক হয়রানি এড়াতে বাধ্য হয়েই ডিলাররা প্রতিদিন তাঁর হাতে এই নগদ অর্থ তুলে দিচ্ছেন।

​জাকিরের ঘুষ আদায়ের সুনির্দিষ্ট ছক

  • ​ফাইলপ্রতি বাধ্যতামূলক বখরা: তালিকাভুক্ত অন্তত ৪০ জন ডিলারের ফাইল ছাড় ও নিয়মিত বরাদ্দ প্রক্রিয়াকরণের নামে ফাইলপ্রতি ২০০ টাকা করে আদায় করা হয়।
  • ​ট্রাকসেল ডিলারদের দৈনিক নজরানা: খোলাবাজারে ট্রাকে বা গাড়িতে চাল-আটা বিক্রির ডিলারদের কাছ থেকে গাড়িপ্রতি এককভাবে দৈনিক নেওয়া হয় ৫০০ টাকা। টাকা দিতে সামান্য দেরি হলেই নথিপত্র আটকে চরম ভোগান্তিতে ফেলা হয়।
  • ​তদারকি কর্মকর্তাদের ‘স্পট বাণিজ্য’: ডিলারদের পণ্য সঠিকভাবে বণ্টন হচ্ছে কি না, তা তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের লাভজনক ও সুবিধাজনক পয়েন্ট/স্পটে পোস্টিং দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মাসিক চুক্তিতে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেন তিনি।
  • ​শীর্ষ কর্মকর্তাদের নাম ভাঙানো: জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকসহ বড় কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করার দোহাই দিয়ে জাকির নিয়মিত অর্থ দাবি করেন। ডিলারদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়—‘বড় স্যারের টেবিল ঠান্ডা না রাখলে ফাইল সই হবে না’।

​ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব

​নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ডিলার জানান, ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই তাঁরা জাকিরের এই অনৈতিক দাবি মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে এক ডিলার বলেন, “আমরা খাদ্যশস্য বিতরণ করতে এসে সামান্য এক কম্পিউটার অপারেটরের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছি। দিনে ৩০ হাজার টাকার নিচে তার কালেকশন নামে না। যারা গাড়িতে বিক্রি করে তাদের কাছ থেকে ৫০০ এবং সাধারণ ফাইলপ্রতি ২০০ টাকা না দিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখে সময়ক্ষেপণ করে। প্রতিবাদ করলে বড় স্যারদের নাম ভাঙিয়ে লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দেয় সে।”

​আরেক ভুক্তভোগী বলেন, “অফিসের শীর্ষ কর্তারা এসবের ভাগ পান কি না তা তদন্তের বিষয়, তবে মূল কারসাজি ও ব্ল্যাকমেইলিংটা হয় এই অপারেটরের টেবিলেই।”

​সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি ১৯৭৯ ও দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী, কোনো কর্মচারীর এ ধরনের চাঁদাবাজি, দাপ্তরিক নথিপত্র জিম্মি করা ও ক্ষমতার অপব্যবহার সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ ও গুরুতর অসদাচরণের শামিল।

​অভিযুক্ত ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

​এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের কম্পিউটার অপারেটর জাকির হোসেনের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফোন রিং হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

​ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মাহমুদুল হাছান এ বিষয়ে বলেন, “অপারেটর জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে ডিলার জিম্মি করে টাকা আদায়ের বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমার কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। তবে অভিযোগ পেলে এবং সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে কঠোর বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।”