ক্ষমতার আড়ালে নৈতিক স্খলন: এক কর্মকর্তার বিতর্কিত অধ্যায় ও প্রশাসনের ভাবমূর্তি

জাহিদ হাসান

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাঠপর্যায়ে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক স্তম্ভ। কিন্তু যখন সেই পদের ধারক নিজেই নৈতিক স্খলন ও পর্নোগ্রাফির মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তখন তা পুরো প্রশাসন যন্ত্রের জন্যই লজ্জাজনক হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ইউএনও (বর্তমানে ওএসডি) মো. আলাউদ্দিনের একাধিক আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

হাতিয়া থেকে সুনামগঞ্জ: বিতর্কের দীর্ঘ পথ

সাগরপাড়ের দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া থেকে এই বিতর্কের রেশ এখন মেঘালয় পাহাড়ঘেঁষা হাওরাঞ্চল সুনামগঞ্জেও আছড়ে পড়ছে। কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, মো. আলাউদ্দিন এর আগে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও শাল্লা উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। হাতিয়ার ঘটনার পর তাঁর পুরনো কর্মস্থলগুলোতেও এখন আলোচনার ঝড় বইছে। অভিযোগ উঠেছে, তিনি কেবল ভিডিও কেলেঙ্কারিতেই নয়, বরং সাধারণ মানুষের ওপর ক্ষমতার অপব্যবহার ও রূঢ় আচরণেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন।

পেশাগত অনিয়ম ও সাধারণের আর্তনাদ

ভাইরাল ভিডিওর পাশাপাশি সুনামগঞ্জের শাল্লা ও তাহিরপুরে তাঁর দায়িত্ব পালনকালীন নানা অনিয়মের তথ্য সামনে আসছে। শাল্লার আনন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা মৃদুল দাসের অভিযোগ, আলাউদ্দিন এসিল্যান্ড থাকাকালে কোনো মাপজোক ছাড়াই তাঁর বৈধ জমির ওপর নির্মিত ওয়ার্কশপ তিনবার ভেঙে দেন, যাতে প্রায় ১০-১২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। পরবর্তীতে মাপজোকে দেখা যায় সেই জমি সরকারি ছিল না।

শুধু জমি সংক্রান্ত বিরোধই নয়, জুতায় কাদা লাগার মতো তুচ্ছ কারণে ট্রলি চালককে মারধর করে হাড় ভেঙে দেওয়ার মতো অমানবিক অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। স্থানীয় ছোট দোকানদারদের ওপর অতিরিক্ত জরিমানা ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার মাধ্যমে তিনি এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।

ওএসডি ও আত্মপক্ষ সমর্থন

দেশব্যাপী ব্যাপক সমালোচনার মুখে গত মঙ্গলবার রাতেই মো. আলাউদ্দিনকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা হয়েছে। যদিও তিনি দাবি করেছেন, এই ভিডিওগুলো ‘এআই’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন, ৯ থেকে ১৮ মিনিটের দীর্ঘ ভিডিওগুলো কি সত্যিই প্রযুক্তির কারসাজি নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর কোনো অন্ধকার সত্য?

নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং যাচাই-বাছাই চলছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তা বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন এবং তাঁর ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

প্রশাসনের শুদ্ধি অভিযান প্রয়োজন

জনগণের সেবক হওয়ার শপথ নিয়ে যারা ক্ষমতার অপব্যবহারে মত্ত হন এবং ব্যক্তিগত জীবনে অনৈতিকতায় লিপ্ত হন, তাদের কারণে সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। মো. আলাউদ্দিনের এই ঘটনাটি কেবল একজন ব্যক্তির অপরাধ নয়, বরং এটি প্রশাসনিক কাঠামোতে নৈতিকতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে পুনরায় সামনে এনেছে। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে যদি এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই হতে পারে প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার একমাত্র পথ।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *