কৃষি কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেনের বক্তব্যের পর পাওয়া অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক

শেরপুর সদর উপজেলায় গত অর্থবছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসের সারের সংকটকালীন সময়ে দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতি মোকাবিলা না করে, কর্মস্থল থেকে বদলির ঠিক প্রাক্কালে সাবেক সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনের দায়ের করা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর পেছনে তাঁর নিজস্ব গাফিলতি ও অনিয়ম গোপনের কৌশল উন্মোচিত হয়েছে। মাঠ প্রশাসনের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ক্ষুণ্ণ করে জেলা প্রশাসককে (ডিসি) অযাচিতভাবে এই বিতর্কে জড়িয়ে একটি চিহ্নিত চক্র অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।

​দায়িত্বে গাফিলতি ও সুযোগসন্ধানী মামলা

​জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত অর্থবছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে সারের যে সংকট তৈরি হয়েছিল, সে সময় শেরপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে মো. আনোয়ার হোসেন সরাসরি দায়িত্বরত ছিলেন। একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সংকট চলাকালে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে কিংবা সার মনিটরিং কমিটিকে অবহিত না করে নিষ্ক্রিয় ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে নিজের কর্মস্থল থেকে বদলির আদেশ হওয়ার পর, সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গত ৮ জুলাই পুরোনো বিষয়টিকে সামনে এনে হুট করে মামলা দায়ের করেন।

​প্রশ্ন উঠছে—সারের সংকটকালে নিজের দায়িত্বে যে চরম গাফিলতি তিনি প্রদর্শন করেছিলেন, তা থেকে নজর সরাতেই বদলির প্রাক্কালে এ ধরনের আকস্মিক পদক্ষেপ নিয়েছেন কি না।

​ডিলারদের জিম্মি ও অর্থ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ

​স্থানীয় ডিলারদের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে জানা গেছে, সাবেক ওই কৃষি কর্মকর্তা সারের আইনি ব্যবস্থাপনার দোহাই দিয়ে ডিলারদের বৈধ ব্যবসায়িক রেজিস্টার, ক্যাশ মেমো ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র বলপূর্বক জব্দ করেন।

​তবে যোগাযোগ করা হলে মো. আনোয়ার হোসেন স্বীকার করেন যে, তিনি এক ডিলারের কাছ থেকে নগদ ৩ লাখ টাকা সদর উপজেলার কৃষি অফিসার মুসলিম খানম নিলুর মাধ্যমে ঋণ হিসেবে নিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে সেই ঋণ পরিশোধও করে দিয়েছেন। একই সাথে তিনি স্পষ্ট স্বীকার করেন, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা ইয়াসমিন সার দুর্নীতির সাথে কোনোভাবেই জড়িত নন। ফোনে কথা হওয়া প্রসঙ্গে তিনি জানান, ডিসি তাঁকে শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘মামলা কেন করলেন’, কিন্তু মামলা উঠিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কোনো কথা বলেননি।

​তবে সারের ডিলারদের নামে মামলা করার পর কেন তাঁদের কাছে অর্থ ঋণ নেওয়া হলো—তা নিয়ে জোর প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগও জমা পড়েছে জেলা প্রশাসকের কাছে। তাছাড়া, সংগৃহীত ব্যবসায়িক নথিপত্র পরবর্তীতে যথাযথ নিয়ম মেনে ডিলারদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি বলেও সিসিটিভি ফুটেজ ও ডিলারদের তথ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

​প্রশাসনিক শৃঙ্খলাভঙ্গ ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা

​জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা ইয়াসমিন স্পষ্টভাবে জানান, যেকোনো সরকারি কর্মকর্তা কোনো ফৌজদারি আইন বা বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করতে গেলে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি (ডিসি) এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় রক্ষা করা প্রশাসনিক নিয়ম।

​তবে কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন এই আইনি ও প্রশাসনিক নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একক সিদ্ধান্তে পদক্ষেপ নেন, যা সরকারি কর্মচারীদের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও পেশাগত আচরণের পরিপন্থী।

​অপপ্রচারের জবাবে জেলা প্রশাসন

​ঘটনার পর ছড়িয়ে পড়া একটি ফোনালাপকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে ভুল বার্তা ছড়ানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। মূলত জেলা প্রধান হিসেবে মাঠ প্রশাসনের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষা, দায়িত্বে অবহেলা রোধ এবং ডিলারদের জবরদস্তিমূলক হয়রানির সুরাহা করতেই জেলা প্রশাসক উক্ত কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন।

​কিন্তু কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ও অসৎ উদ্দেশ্যে ফোনালাপের খণ্ডাংশ প্রকাশ করে পুরো ঘটনাকে ভিন্ন খাতে ঘোরানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। বর্তমানে শেরপুর জেলায় কোনো সারের ঘাটতি নেই এবং জেলা প্রশাসন ও বাফার গুদাম মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সার সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রাখা হচ্ছে।