নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

সময়টা ১৯৮১ সালের ২ জুন। কান্নায় ভেঙে পড়া লাখো মানুষের জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ। উদ্দেশ্য—অকালে ঝরে পড়া রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শেষ বিদায় জানানো। ঠিক ৪৪ বছর পর, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর, সেই একই প্রাঙ্গণ আবারও সাক্ষী হলো এক ঐতিহাসিক বিদায়ের। এবার বিদায় নিচ্ছেন জিয়ারই সহধর্মিণী, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
একই স্থান, একই শোকের আবহ
সংসদ ভবনের পেছনে স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হতে যাচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া। দাফনের আগে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায় এক অদ্ভুত মিল। ৪৪ বছর আগে এই রাজপথ যেভাবে লাখো মানুষের ঢলে প্লাবিত হয়েছিল, আজ দেশনেত্রীর বিদায়বেলায়ও সেই একই দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। যেন মহাকালের এক বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো আজ।
জিয়াউর রহমানের সেই বিষাদময় বিদায়
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তখন বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অন্তরালে থাকা এক সাধারণ গৃহবধূ। স্বামীর সেই আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো জাতি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। ২ জুন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তাঁর জানাজায় মানুষের যে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।
গৃহবধূ থেকে ‘আপসহীন নেত্রী’
স্বামীকে হারানোর সময় খালেদা জিয়ার পরিচয় ছিল কেবলই ‘ফার্স্ট লেডি’। দুই সন্তান তারেক ও আরাফাত রহমানকে নিয়েই ছিল তাঁর জগত। কিন্তু জিয়ার মৃত্যুই তাঁকে টেনে আনে রাজনীতির কঠিন ময়দানে। কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই বিএনপির হাল ধরেন তিনি। রাজপথের দীর্ঘ সংগ্রাম, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন আর জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের প্রথম নারী সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি গড়েন নতুন ইতিহাস।
বদলে যাওয়া ঢাকা, অপরিবর্তিত আবেগ
১৯৮১ সালের ঢাকা আর ২০২৫ সালের ঢাকার মধ্যে ব্যবধান বিস্তর। জনসংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুণ, বদলে গেছে শহরের অবকাঠামো। কিন্তু মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে মানুষের আবেগের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ৪৪ বছর আগে মানুষ যেভাবে প্রিয় নেতার জন্য চোখের জল ফেলেছিল, আজ তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি বেগম খালেদা জিয়ার জন্যও রাজধানীর রাজপথ জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে।
মিলন হবে জিয়া উদ্যানে
বেগম খালেদা জিয়া আজীবন তাঁর স্বামীর আদর্শ ও রাজনৈতিক ধারাকে ধারণ করেছেন। নিজ মেধা আর আপসহীন নেতৃত্বে বিএনপিকে নিয়ে গেছেন সাধারণ মানুষের দুয়ারে। আজ দাফনের মাধ্যমে তিনি জিয়াউর রহমানের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন। এই অন্তিম শয়ানের মধ্য দিয়ে তিনি কেবল স্বামীর পাশেই ফিরছেন না, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে চিরস্থায়ী আসন করে নিলেন।
Leave a Reply