উজানে বৃষ্টি হলেই আতঙ্ক বাড়ে পাহাড়ি জনপদেবন্যার পানিতে বারবার ডুবছে শেরপুর
নালিতাবাড়ি (শেরপুর) প্রতিনিধি
২২শে সেপ্টেম্বর ২০২৫

উজানে বৃষ্টি হলেই আতঙ্ক বেড়ে যায় পাহাড়ি জনপদে। উজানের ভারী বর্ষণ পাহাড়ি ঢলের সৃষ্টি করে। এতেই বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ১৯৮৮ সালের পর ২০২৪ সালে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার সাক্ষী হয় শেরপুর জেলাবাসী। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাত হাজারের বেশি ঘরবাড়ি। পানিতে ডুবে নষ্ট হয় কয়েক হাজার হেক্টর জমির ফসল। ভেসে যায় দেড় হাজারের বেশি পুকুর ও ঘেরের মাছ। পাঁচটি উপজেলার প্রায় ৭০০ কিলোমিটার সড়ক, শতাধিক সেতু, কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাণ হারান ১০ জন।
২০২৪ সালের বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে না উঠতেই আবারও আকস্মিক বন্যার কবলে শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার মানুষ। গত বৃহস্পতিবার বেলা দেড়টার দিকে খৈলকুড়া এলাকায় মহারশি নদীর বাঁধ ভেঙে অন্তত ১০টি গ্রামের নিম্নাঞ্চলের আমন ক্ষেত প্লাবিত হয়। এতে এক মুহূর্তে ভেসে যায় অন্তত ১১টি পরিবারের বসতভিটা। ভেঙে পড়ে বিদ্যুতের খুঁটি, ভেসে যায় ৫০টির বেশি মাছের ঘের। পানিতে ৩৪৫ হেক্টর জমির আমন ধান সম্পূর্ণ এবং ৫৭৫ হেক্টর আংশিকভাবে নিমজ্জিত হয়। পাশাপাশি ৩৫ হেক্টর সবজির ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যায়। একই সঙ্গে বাঁধ উপচে ঝিনাইগাতী সদরের বাজারসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। ঢলের তীব্র স্রোতে পড়ে মারা যায় দুজন।
এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন নদীপারের মানুষ। ইউপি সদস্য জাহিদুল হক মনির অভিযোগ করেন, ২০২২ সালের ঢলে মহারশি নদীর ব্রিজ পাড়ের এই বাঁধ ভেঙে গেলেও সংস্কার হয়নি। তাই এ বছর আবারও একই জায়গায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। গেল বছরের বন্যায় ভয়াবহ ক্ষতির পর চলতি বছর বালু ভর্তি কিছু জিওব্যাগ ফেলে দায় সেরেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
খৈলকুড়া গ্রামের বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, ‘ঢলের পানিতে মহারশি নদীর বান্দ (বাঁধ) ভাইঙ্গা সব শেষ অইয়া গেছে। ২০ শতাংশ আমন ফসলে মধ্যে ১০ শতাংশ জমিতে বালু পইড়া গেছে। অর্ধেক ফসল শেষ। ভিটামাটিসহ শেষ সম্বল দুইডা টিনের ঘর ভাইঙ্গা গেছে। ঘরে থাকা সব জিনিস ঢলের পানি ভাসাইয়া নিছে। অহন কই থাকমু? কী করমু?’
কেন ঘন ঘন বন্যার কবলে শেরপুর
ভারতের মেঘালয় ও আসাম অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত এবং পাহাড়ি ঢলের পানি বাংলাদেশের নদীগুলোতে নেমে আসা, নদনদীর তীরবর্তী এলাকায় টেকসই বাঁধের অভাব বা বাঁধ ভেঙে যাওয়া, অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা, নাব্য হারানো, প্রাকৃতিক জলাধার বেদখল, অপরিকল্পিত বাঁধ ও সড়ক, আবাসনের জন্য যত্রতত্র একের পর এক গ্রাম তৈরি, পানির স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ– এসব কারণে শেরপুরের বিভিন্ন উপজেলা ঘন ঘন বন্যার কবলে পড়ছে। পরিবেশবিদ, স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্রিন ভয়েসের’ সভাপতি রফিক মজিদ বলেন, ঢলে প্রতিবছর শত শত মানুষের ঘরবাড়ি ও জমির ফসল বিনষ্ট হচ্ছে। নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করায় পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়ছে। নদীর স্বরূপ পরিবর্তন হচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনার অভাবে প্রতিবছর এভাবেই মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখিনুজ্জামান জানান, চলতি বছর মহারশি নদীর বিভিন্ন অংশে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। খৈলকুড়া ব্রিজপাড় এলাকায় বাঁধ কিছুটা নিচু থাকায় পাহাড়ি ঢলের চাপে নতুন করে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
