মুখোশের আড়ালে মানুষ নাকি মানুষের আড়ালে মুখোশ?

দ্বিতীয় পর্ব

খালেক মাস্টারের মহানুভবতার প্রথম পর্ব, রাষ্ট্রীয় দলিলের ইতিহাসে এক অনন্য ও অদ্বিতীয় দৃষ্টান্ত

শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

এই পক্ষের মোট ১৫ জনের পৃথক পৃথক ধারনকৃত বক্তব্য ও মন্তব্য সম্মিলিতভাবে গ্রহণ না করার ফলে তদন্তের প্রয়োজন এখানে একেবারেই তৈরি হয়নি! কারণ, সাহসী, সাবলীল, সকলের বক্তব্যের মধ্যে গড় অমিলই (on the record) ৬৫ শতাংশ! সেই বক্তব্যের ন্যারেটিভ নিচে উপস্থাপন করা হলো-

৮২ বছরের জীবনের ওই পড়ন্ত বেলায় এসে রাষ্ট্রপ্রদত্ত ‘শত্রু এক ধরনের ধিক্কার তার কানে পরোক্ষভাবে কেউ ক্লান্তিহীন ভাবে বিগত ২২ বছর যাবৎ শুনিয়ে চলেছে! অদৃশ্য ও অভিশপ্ত তকমায় চরমভাবে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছিল নির্মল চন্দ্র আইচের নিঃসঙ্গ জীবন। পরিবারের কোনো সদস্য তখন তাঁর পাশে ছিলেন না; তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ একা। চারপাশ ঘিরে ছিলেন কেবল আব্দুল খালেক মাস্টার আর তাঁর প্রতিচ্ছবি মতো কিছু সেবক। তাঁদের সার্বক্ষণিক সঙ্গ, জীবনযাপনের প্রতিটি প্রয়োজনে পরিবারের সদস্যের মতো পাশে থাকা এবং বৃদ্ধের প্রতি অতিরিক্ত যত্ন-আত্তি ছিল তাঁদের সীমাহীন পারিবারিক দায়িত্ববোধের এক অনন্য পরিচয়। কিন্তু সেই যত্নের মধ্যেও বৃদ্ধের অন্তরে তখন একটাই আকুতি, রাষ্ট্রের এই রোষানল থেকে তাঁর এই ভিটেমাটি ও পরকালের শঙ্কা কীভাবে দূর হবে?

তাঁদের পারস্পরিক দাবি অনুযায়ী, মাস্টার সাহেব অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে তখন বলেছিলেন, “নির্মলবাবু, আপনার এই বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আপনি যদি গোহাইলকান্দির এই বিশাল সম্পত্তির অভিশপ্ত বোঝা আমাদের জিম্মায় সঁপে দিয়ে আকুয়ার এই ৬ শতাংশ জমিটুকু নিজ নামে বুঝে নেন, তবে শত্রুর সম্পত্তির পাপের বোঝা থেকে আপনার আত্মা অন্তত রক্ষা পাবে! ”উত্তরে নির্মলবাবু শঙ্কাভরা কণ্ঠে বললেন “বাবা খালেক, আজ তো আমি চলেই যাব, এত অল্প সময়ে এতগুলো কাজ তুমি একা কীভাবে সম্পন্ন করবে?” উত্তরে দৃঢ়চেতা খালেক মাস্টার তখন আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, “সে আপনি নিয়ে ভাববেন না। আপনার সব দায়িত্ব আজ থেকে আমার। কোথাও কোনো অবহেলা বা বিলম্ব হবে না।

অসামঞ্জস্যপূর্ণ ঐতিহাসিক এওয়াজ বদল দলিল (৫৪৭৭ নম্বর)

পাঠকদের উদ্দেশ্যে বিনীতভাবে অনুরোধ করছি, এখানে কয়েকটি লাইন অত্যন্ত গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়বেন:
“তাঁদের এই সুচিন্তিত বয়ান অনুযায়ীই সেদিন ময়মনসিংহ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সম্পাদিত ও স্বাক্ষরিত হলো বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার ইতিহাসের সবচেয়ে ও চরম বিপরীতানুপাতিক ৫৪৭৭ নম্বর ‘এওয়াজ বদলের ২য় পর্ব’ (Exchange) দলিল! যেখানে প্রায় ৬০০ শতাংশের (প্রায় ৬ একর) সুবিশাল সাম্রাজ্য, আর ৪/৫ মিনিটের পায়ে হাঁটা দূরত্বের ৬ শতাংশের টিনশেডের জরাজীর্ণ অট্টালিকা, দুটি সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যকর ও বিপরীতমুখী সংখ্যা আইনি কাগজপত্রে আবদ্ধ হয়ে এক সূত্রে বন্দি হলো।”

নাটকীয় অন্তিম মুহূর্ত ও পৌরসভার ছাই-দাখিলের প্রস্থানপত্র

দলিল সম্পাদনের আনুষঙ্গিক আনুষ্ঠানিকতা তো সাব-রেজিস্ট্রারের টেবিলেই সাঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আইনি ও সামাজিক লৌকিক বিধান অনুযায়ী, দাতা নির্মল আইচের পক্ষে নিজের পুরোনো ভিটায় ফিরে মারা যাওয়া কোনোক্রমেই সম্ভব ছিল না! দানের নিয়ম ও বিনিময়ের প্রথাগত শর্ত রক্ষা করতে তাঁকে তো প্রথমে সদ্যপ্রাপ্ত সেই ৬ শতাংশের ঠিকানাতেই পদার্পণ করতে হতো। এবং তাঁদের সেই বয়ানের নাটকে ঘটলও ঠিক তা-ই! সেই মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই যেন স্বর্গের সুবাতাস এসে স্পর্শ করল বৃদ্ধকে; পরম শান্তিতে তিনি চিরদিনের জন্য মহাপ্রয়াণের পথে পা বাড়ালেন।

দ্বায়িত্বশীল খালেক মাস্টারও তাঁদের কথামতো বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে নিজের কথা রাখলেন। মৃত্যুর ঠিক পরপরই কাঁধে নেওয়া সেই দায়িত্বের এক চুলও নড়চড় হতে দিলেন না। অতীব দ্রুততায় দেহ শ্মশানে নিয়ে দাহ সম্পন্ন করা করে, লোটাভরা ভস্ম গঙ্গার পবিত্র জলে বিসর্জন দিয়ে পৌরসভা কার্যালয় থেকে ছাই-দাখিল সাপেক্ষে অফিশিয়াল মৃত্যুর চূড়ান্ত রসিদ (নং ৪৮/getQuery/১৯৮৭) সংগ্রহ করে পুরো প্রক্রিয়ার ওপর এক পবিত্র সিলমোহর এঁকে কাজ শেষ করলেন!

একই দিন, অর্থাৎ ২৩শে মার্চ ১৯৮৭ সালে সম্পাদিত ঐতিহাসিক এওয়াজ বদল দলিল এবং ওই একই তারিখে পৌরসভার নথিতে ছাই-দাখিলের প্রস্থানপত্র, দুটো মিলে তৈরি হলো এক ঐতিহাসিক লগ্ন।

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নথিপত্রে দলিলটির অস্তিত্ব এবং পৌরসভার নথিতে একই তারিখের ছাই-দাখিলের প্রস্থানপত্র, উভয়ই আজ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সংরক্ষিত রেকর্ডের অংশ। সময়ের ব্যবধানে ব্যক্তিগত স্মৃতি ম্লান হয়ে যেতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় নথিতে সংরক্ষিত তারিখ ও বিবরণ ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়কে ধরে রাখে।

শ্রেষ্ঠ দাতার গৌরব বনাম মূল মালিকের উত্তরাধিকারীদের না পাওয়ার বেদনা

আব্দুল খালেক মাস্টারের ওয়ারিশরা আজও নিজেদের দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দাতা এবং রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিবারের উত্তরাধিকারী বলে গর্বের সঙ্গে পরিচয় বহন করেন। তাঁদের সেই পরিচিতি ও পারিবারিক গৌরবের ইতিহাসের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মনে একটি মানবিক প্রশ্নও থেকে যায়। যাঁর বা যাঁদের পৈতৃক ভিটার ওপর দাঁড়িয়ে আজ এই দাতা পরিচয়ের এত গৌরব, সেই মূল মালিক নির্মল চন্দ্র আইচের প্রকৃত উত্তরাধিকারী ও দৌহিত্ররা যখন অধিকারের আশায় দ্বারে দ্বারে প্রতীক্ষায় ঘুরে বেড়ান, তখন সেই ‘সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা’র বংশধরদের পক্ষ থেকে সামান্য পরিপূরক এক ফোঁটা স্নেহের পরশ কি প্রকাশ পেতে পারে না?

(চলবে…)

অভিজ্ঞতার আলোকে অনুসন্ধানের পরিধি ও আগামী পর্বের প্রতিশ্রুতি

শ্রদ্ধেয় প্রিয় পাঠকগণ, এক রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বরেণ্য সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ দম্পতির পুত্র এবং বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের ১৯৯৬ সালের ব্যাচে সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ নিয়ে অদ্যাবধি বহু অনন্য অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। কিন্তু ‘আইচ-মাস্টার’ এই ঘটনা আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার সমস্ত মাত্রা অতিক্রম করে গেছে!

রোমহর্ষক এই গল্পের প্রতিটি বাক্য, শব্দ ও বর্ণের পেছনে একাধিক অকাট্য সত্যের দ্বারা সুদৃঢ় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত! অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি, তথাপি সব তথ্য আপনাদের আদালতে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে উপস্থাপন করতে সক্ষম হইনি! আগামী দুই-তিনটি পর্বে নথিজাত তথ্যের পোস্টমর্টেম অর্থাৎ ময়নাতদন্তপূর্বক আরও তথ্য উপস্থাপন করে শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও এই অনুসন্ধানের সুমহান পরিধি অতিক্রম করে শেষ করতে পারব, এমন গ্যারান্টি দিতে পারছি না! তবে পরের পর্বগুলো পড়তে ভুলে না যাওয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ রাখছি!