মুখোশের আড়ালে মানুষ নাকি মানুষের আড়ালে মুখোশ?

শ্রেষ্ঠ দাতার পরিচয়ের আড়ালে রাস্ট্রের শ্রেষ্ঠ গ্রহীতার সার্টিফিকেট তারই কাছ থেকে পেলাম!

​শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

স্কুলের শ্রদ্ধেয় বোন এবং খালেক মাস্টারের পুত্রবধূ শান্তা আপুর কাছ থেকেই প্রথম জেনেছিলাম, আব্দুল খালেক মাস্টার রাষ্ট্রীয়ভাবে শ্রেষ্ঠ দাতা হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছিলেন।

সত্য প্রকাশের পথে কোন কোন বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, সে সম্পর্কেও তিনি আমাকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলাদাভাবে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ছোট ভাই এর প্রতি তার পরোক্ষ যত্নশীল দৃষ্টি এবং মঞ্চে প্রতিপক্ষ হয়েও আড়াল থেকে খেয়াল রাখা এবং রিসালাত প্রেরণ করার মাধ্যমে আমার অনুসন্ধানের কাজে বহুবার সহায়তা করেছেন তিনি।

​সেই শ্রেষ্ঠ দাতার পরিচয়ের পেছনের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে আমাকে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার সমগ্র দলিলিক ইতিহাস ঘাঁটতে হয়নি।

​কারো কাছে চাইতেও হয়নি। আপুর সঙ্গে দেখা করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে লালসালু পরিহিত এক বার্তা প্রেরক শুধু সেই ডকুমেন্টস গুলো আমাকে প্ররণ করলেন, যার দ্বারা আমার হস্তে লিখিত এই গল্পের সাম্প্রতিক সবগুলো প্রতিবেদনের ভিত্তি ইস্পাত-দৃঢ় অবস্থায় উন্নীত করলেন!

সেখানেই এক বিস্ময়কর তথ্যের মুখোমুখি হয়েছি। যাঁকে জেনেছিলাম শ্রেষ্ঠ দাতা হিসেবে, তাঁকেই দেখতে পেলাম সর্বোচ্চ গ্রহীতার ভূমিকায়!

ঐতিহাসিক প্রজ্ঞাপন ও নিষ্পেষিত হৃদয়ের যন্ত্রণা

ফিরে আসি প্রসঙ্গে, ২৩শে মার্চ ১৯৮৭। ‘চাউলের সর্বনিম্ন মূল্য ১১ টাকার নিচে নহে! কোথাও কোথাও ১৩ টাকা!’ শিক্ষক তুল্য সাংবাদিক আলমগীর ভাই ৮৭ সালের ২৩ শে মার্চের ইত্তেফাকে লেখাটি ছিল শীর্ষ সংবাদ! পছন্দ না হওয়ায় তা অযত্নে সরিয়ে রেখে বিছানার পাশে সযত্নে রাখা ওই মাসেরই ২ তারিখের ‘দৈনিক জাহান’ পত্রিকার দিকে চোখ রাখলেন নির্মলবাবু। ময়মনসিংহের শক্তিশালী সাংবাদিক ও জাহানের চিফ রিপোর্টার কাজী ইয়াসিনের লেখা একটি রিপোর্টের পানে! গত কুড়ি দিনে কুড়ি বারের বেশি পড়ার ফলে সবটাই তাঁর মুখস্থ হয়ে গেছে, তবুও প্রতিদিনই আবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন। নস্টালজিক কিন্তু প্রচন্ড কষ্টের স্বাদ নেন, আর ভাবেন – কী অপরাধ ছিল তাঁদের? শত বছর ধরে বংশপরম্পরায় রাজ্যের প্রতিটি নিয়ম শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে ও সময়মতো পালন করে এসেছেন তাঁরা! কেন এই পরিবারটিকে এভাবে ছিন্নভিন্ন করে নিশ্চিহ্ন করা হলো? ১৯৬৫ সালের পরবর্তী সময়ে এই পরিবারের সঙ্গে যা হয়েছিল, তা অবর্ণনীয়। লাখো বাঙালির চেয়েও অধিক দেশপ্রেম লালন করে গত ২২টি বছর যাবৎ কেবল ‘শত্রু’ নামক পরিচয় নিয়ে তাদের মতো যাঁরা এ দেশে বসবাস করছিলেন, তাঁদের সেই হৃদয়ে দহনের যে অনুভূতি তা এদেশের কোনো মুসলমানের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়।

‘দৈনিক জাহান’-এ তার ঠিক কুড়ি দিন আগে, অর্থাৎ ২রা মার্চে ছাপা হয়েছিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সরকারের জারি করা ‘কালির তালিকা’র (Inked Census List) প্রশাসনিক প্রজ্ঞাপন। ১৯৬৫ সালের পর নিকৃষ্টতম উদ্দেশ্যে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান প্রণীত মহাপাপের পথটি বন্ধ এবং ঘৃণ্য চক্রান্তে প্রণীত পেন্সিল দিয়ে দলিল রচনার সেই ধারা বাতিল করে এরশাদ সরকার!

সেই থেকে নির্মলবাবু প্রৌঢ় বয়সেও তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে ভেসে বেড়ানোর কারণে ওই ২৩ তারিখে তাঁর সঙ্গে ঠিক কী কী হতে চলেছে, তার কিছুই অনুধাবন করতে পারেননি! এরশাদ সাহেবের কালিকলমের প্রজ্ঞাপন জারি হয়ে গেছে; এবার সব দলিল পাকা হয়ে যাবে, সারাক্ষণই এই ভাবনায় নিমজ্জিত থাকতেন!

আইনি পরিক্রমা ও প্রতিবেদকের অঙ্গীকার

(উল্লেখ্য, পূর্বেও এই বিষয়টি নিয়ে লিখেছিলাম, টানা আট-নয়টি পর্ব! অতঃপর উভয় পক্ষের, অর্থাৎ আইচ – মাস্টার পরিবারের পক্ষ থেকে আসা নথিপত্র। পাশাপাশি মাস্টারদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, এমনকি তৎকালীন সময় থেকে অদ্যাবধি তাঁদের সঙ্গেই রয়েছেন বলে সমাজে চিহ্নিত এমন কিছু লোকের আরও কতিপয় বিদ্যুৎসাহী নিয়ে তৃতীয় থেকে শুরু করে দশম পর্যন্ত বাকি সাতটি পক্ষের দেওয়া অসংখ্য প্রমাণসম্বলিত তথ্য সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপনপূর্বক আদালতের গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নিবন্ধিত করে এসে পুনরায় লিখছি। ইতিমধ্যে বেশ কিছুদিন সময় চলে গেছে! এই প্রতিবেদন থেকে শুরু করে আগামী বেশ কয়েকটি পর্ব প্রথমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচরীভূত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লিখতে হচ্ছে! অর্থাৎ যেকোনো তথ্যের সত্যায়িত প্রত্যয়ন প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে চাহিবামাত্র এই সংবাদপত্রের পক্ষ থেকে আবেদিত পথেই প্রদান করতে বাধ্য থাকার প্রতিশ্রুতি প্রদান করছি আমি!

​শ্রী নির্মল চন্দ্র আইচ: শিকড়ের টানে অকুতোভয় অস্তিত্ব

আবার ফিরে আসি প্রসঙ্গে, শ্রী নির্মল চন্দ্র আইচ। কেবল কোনো সাধারণ জমির মালিক ছিলেন না। ১৯৬৫ সালের সেই উত্তাল ও কঠিন সময়েও দেশত্যাগের সমস্ত ভীতি, হুমকি বা সুযোগ ও প্রলোভন উপেক্ষা করে আত্মবিশ্বাসের পাহাড় বুকে নিয়ে নিজেকে ‘শত্রু’ জেনেও এ দেশে নিজের সম্পদের টানে নয়, স্বভাবের কারনে আর স্মৃতির টানে রয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন গোটা অঞ্চলের মানুষের শেষ ভরসার এক আশ্রয়স্থল। হাত দেখা বা কোষ্ঠী বিচার করানোর জন্য বহু দূর থেকে মানুষ তাঁর কাছে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারত। মানুষের সংকটের উপযুক্ত সমাধান পথ দেখিয়ে দিতেন। একাধারে এক অকুতোভয় ও জ্ঞানী অ্যাস্ট্রোলজার হিসেবে তাঁর নামডাক পুরো এলাকায় শ্রদ্ধার সঙ্গে ছড়িয়ে ছিল।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে মাটি আর জনপদ নিজের সবকিছু ছিল, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পালাবদলে রাতারাতি নিজেকে সেই দেশেরই ‘শত্রু’ বা ভিনদেশি হিসেবে আবিষ্কার করার যে মর্মান্তিক মানসিক দহন, তা কেবল সেই ভুক্তভোগী মানুষটিই হাড়ের গভীরে উপলব্ধি করতে পারেন। যে উঠানে একদিন আপনজনদের পদচারণা ছিল, যে ভিটায় বংশের স্মৃতি জমা ছিল, যে জনপদে পরিচিত মানুষের মুখ দেখেই দিন শুরু হতো, সেই জায়গাতেই একসময় নিজের পরিচয় নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটানো কতটা কঠিন, তা বাইরে থেকে অনুভব করা সহজ নয়। এই নির্মম বাস্তবতার মাঝেও নির্মল চন্দ্র আইচ যে বুকভরা সাহস নিয়ে নিজের ভিটায় টিকে ছিলেন, তাঁর সেই প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্বের পরিচয় মিলত তাঁর প্রতিটি স্বাক্ষরে।

(চলবে),,,,,