নামের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস: পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও ময়মনসিংহের
শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

একটি শহরের আসল ইতিহাস কেবল তার সরকারি মহাফেজখানায় বা গেজেটে লিপিবদ্ধ থাকে না; শহরের প্রকৃত ইতিহাস খোদিত থাকে তার রাজপথ, অলিগলি, মহল্লা, ঘাট, বাজার, পুরোনো পাড়াগুলোর নামের মধ্যে এবং তার কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া প্রাচীন নদ-নদীর পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক স্মৃতির ভেতরে। কোনো নামই নিছক ভৌগোলিক পরিচয়ের সূচক নয়; তা বহন করে একটি নির্দিষ্ট বংশ, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক চেতনা, আভিজাত্য এবং শতাব্দীর ইতিহাস।
ময়মনসিংহ শহরের দিকে তাকালে সেই পৌরাণিক ও সামাজিক ভিত্তির গভীরতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই শহরের অস্তিত্ব যার সাথে মেখে আছে, সে তো আর কোনো সাধারণ নদী নয়—সে প্রাচীন ‘ব্রহ্মপুত্র’। পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ ও ঐতিহ্যবাহী এই নদ কোনো ‘সৈয়দ‘ বা ‘খান‘ বংশের নামে চিহ্নিত হয়নি; হাজার বছরের পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক মিথলজিতে তা রূপ নিয়েছিল ‘ব্রহ্মাপুত্র’ বা ‘ব্রহ্মার পুত্র’ হিসেবে। প্রাচীন ভারতীয় পৌরাণিক বিশ্বাস এবং আসাম-বাংলার হাজার বছরের হিন্দু আধ্যাত্মিক চেতনার যে সুগভীর শেকড় এই জনপদের মাটিতে প্রোথিত ছিল, এই নদ-নদীর নামকরণ তারই অকাট্য ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রমাণ।
যে জনপদের প্রাণভোমরা নদীর নামেই একটি হিন্দু পৌরাণিক আভিজাত্য লুকিয়ে ছিল, সেই জনপদের নগরকেন্দ্র, বাণিজ্যিক এলাকা, ঐতিহ্যবাহী মহল্লা ও জমিদারি ভূসম্পত্তির সিংহভাগও যে সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলোর হাত ধরে গড়ে উঠবে—তা ছিল এই মাটিরই স্বাভাবিক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা।
স্থাননাম ও পৌরাণিক পরিচয় কী প্রকাশ করে?
ময়মনসিংহের পুরোনো পাড়া, সড়ক, ঘাট বা এলাকাগুলোর ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, শহরের নগরায়ণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, চিকিৎসালয় নির্মাণ এবং বাণিজ্যিক অবকাঠামো গড়ে তোলার নেপথ্যে যে মূল পুঁজি, জমি এবং সামাজিক নেতৃত্ব কাজ করেছিল—তা এসেছিল মূলত স্থানীয় হিন্দু আভিজাত্য ও ভূম্যাধিকারীদের হাত ধরে।
- ব্রহ্মপুত্রের তীর থেকে নগর বিকাশ: মুক্তাগাছার জমিদার পরিবার থেকে শুরু করে স্থানীয় আইনজীবী, চিকিৎসক ও ব্যবসায়ী সমাজ—যাঁরা ১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর গড়েছিলেন, তাঁদের অবদান শহরের অলিগলির নামকরণে এবং ব্রহ্মপুত্রের ঘাটগুলোতে স্থায়ী ছাপ ফেলে যায়।
- নামকরণের ঐতিহাসিক সত্যতা: আজও ময়মনসিংহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান, সড়ক ও বাণিজ্যিক পয়েন্টগুলোর দিকে নজর দিলে সেই নামগুলো ভেসে ওঠে। কিন্তু যার নামে এই নদী, যার নামে এই সড়ক বা মহল্লা—সেই পরিবারগুলোর রক্তমাংসের উত্তরসূরিরা আজ কোথায়? তাঁদের পৈতৃক বসতবাড়ি, নিজস্ব ভূসম্পত্তি ও শত বছরের আভিজাত্য কীভাবে হাতবদল হলো?
ভাষার অভিন্নতা বাদ দিয়ে ‘ধর্মের রাজনৈতিক দাঁড়িপাল্লা’
ময়মনসিংহের এই বহুত্ববাদী সামাজিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে ধ্বংস করার মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল ১৯৪৭ সালের ধর্মভিত্তিক দেশভাগ। হাজার বছর ধরে যে জনপদ অভিন্ন বাংলা ভাষা, ব্রহ্মপুত্রের পলিমাটি এবং লোকজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ ছিল, রাতারাতি তাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘ধর্মের দাঁড়িপাল্লায়’ মেপে বিভাজিত করা হলো।
- সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের বিনাশ: ধর্মকে রাষ্ট্র ও নাগরিকত্বের একমাত্র ভিত্তি বানানোর ফলে বহুমাত্রিক ও বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থা ধসে পড়ে। যে ব্রহ্মপুত্র নদ যুগ যুগ ধরে সব ধর্মের মানুষকে একই পলি দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে, সেই নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা শহরে মানুষকে রাতারাতি ‘সংখ্যালঘু’ আর ‘সংখ্যাগুরু’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলো।
- ইতিহাস মুছে ফেলার নগ্ন চক্রান্ত: একটি সম্প্রদায়কে উচ্ছেদ করার পর পরবর্তী কৌশলই হয় তাদের ঐতিহাসিক অবদান ও শেকড়কে মুছে দেওয়া। নদের নাম পরিবর্তন করা না গেলেও, নদের তীরের মানুষগুলোকে জোরপূর্বক দেশত্যাগে বাধ্য করে তাঁদের শত শত বছরের পৈতৃক সম্পদ গ্রাস করা ছিল এক পরিকল্পিত ঐতিহাসিক অন্যায়।
নামের ভেতরের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস আজ যা দাবি করে
আজও ময়মনসিংহের রাজপথে হাঁটলে বা ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে দাঁড়ালে যে নামগুলো ভেসে ওঠে, তা কেবল অতীতের কোনো রঙিন স্মারক নয়—তা হলো এই ভূখণ্ডের বঞ্চনা ও ঐতিহাসিক উচ্ছেদের নীরব সাক্ষী।
যে পরিবারগুলো এই শহরের হাসপাতাল, বিদ্যালয়, মুক্তাঙ্গন এবং সড়ক নির্মাণের জন্য শত শত বিঘা জমি দান করেছিল, কিংবা যাঁদের পৈতৃক ভূমির ওপর আধুনিক ময়মনসিংহের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো গড়ে উঠেছে—পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় বৈষম্যমূলক আইন এবং স্থানীয় দখলদারদের হিংস্র থাবায় তাঁদেরই বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে।
ব্রহ্মপুত্রের বহমান স্রোত আর শহরের স্থাননামগুলো আজও প্রমাণ করে যে, এই শহরের ভূমি ও সামাজিক ভিত্তির মূলে কাদের অবদান ছিল। একই সাথে তা আমাদের অনুশাসনের কাঠগড়ায় দাঁড়ায়—আমরা কীভাবে আমাদেরই শহরের রূপকারদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছিলাম এবং কীভাবে তাঁদের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে কেবল ভৌগোলিক নামের খোলসে আটকে রাখা হয়েছে।
(চলবে… পরবর্তী পর্ব: কারা দখল করেছিল সেই ধন-সম্পদ? (প্রতিবেশী ও আইনি ফাঁদ))