সিবিএমসিবি-এর চিকিৎসা নথিতে মারাত্মক বৈপরীত্য: ক্যানসার নাকি ইনফ্লামেশন?

​শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

​ময়মনসিংহের বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ‘কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল (সিবিএমসিবি)’-এর চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্রে নজিরবিহীন দালিলিক বৈপরীত্য ও কালানুক্রমিক অসঙ্গতির চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। একজন রোগীর প্রাথমিক বায়োপসি প্রতিবেদনে ম্যালিগন্যান্ট ক্যানসার ধরা পড়লেও, ওই প্রতিষ্ঠানে অস্ত্রোপচারের পর হিস্টোপ্যাথলজি রিপোর্টে ক্যানসারের কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি!

​এমন গুরুতর চিকিৎসাগত অসঙ্গতি ও তথ্য অধিকার আইন (RTI) ২০০৯ লঙ্ঘনের অভিযোগে ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন কার্যালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও, সেই তদন্তের গতিপথ ও প্রশাসনিক দায়িত্বশীলতা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।

​ক্যানসার নাকি সামান্য প্রদাহ? নথিপত্রের নজিরবিহীন বৈপরীত্য

​অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নথি থেকে দেখা যায়, ময়মনসিংহ ভালুকার বাসিন্দা ৬০ বছর বয়সী রোগী রমজান মোল্লা পেট ব্যথা নিয়ে সিবিএমসিবি-এর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। গত ২৫ জুন ২০২৫ তারিখে সম্পাদিত কোলনোস্কোপি ও পরবর্তীতে ‘মির্জা প্যাথলজি’ থেকে দেওয়া হিস্টোপ্যাথলজি রিপোর্টে (ল্যাব আইডি: ১২৮২৩/২০২৫) স্পষ্ট উল্লেখ করা হয় যে রোগী “Well Differentiated Adenocarcinoma” অর্থাৎ কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত।

​এই রিপোর্টের ভিত্তিতে গত ২৩ জুলাই ২০২৫ তারিখে সিবিএমসিবি-তে তাঁর অস্ত্রোপচার (Right Hemicolectomy) সম্পন্ন করেন অধ্যাপক ডা. তৌফিকুল হক। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর সংগৃহীত মাংসপিণ্ডের হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষার রিপোর্টে দেখা যায়, সেখানে ক্যানসার বা টিউমারের কোনো আলামতই নেই! রিপোর্টে কেবল “Inflammatory lesion” বা সাধারণ প্রদাহের কথা বলা হয়েছে।

​ক্যানসার না থাকা সত্ত্বেও কেন রোগীর শরীর থেকে বড় ধরনের অঙ্গ কেটে বাদ দেওয়া হলো, কিংবা প্রাথমিক বায়োপসি রিপোর্টটি ভুয়া ছিল কি না—এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

​তথ্য অধিকার আইন ও কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া

​এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে সিবিএমসিবি-এর পরিচালক ডা. করিম খানের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তথ্য প্রদানে স্পষ্ট অস্বীকৃতি জানান। অডিও রেকর্ডে দেখা যায়, তিনি বলেন—“না না, হাসপাতালে এরকম তথ্য অধিকার আইন নাই। তথ্য পেতে হলে কোর্টের মাধ্যমে আসতে হবে, ভিকটিমকে নিজে আসতে হবে।”

​একই বিষয়ে সিবিএমসিবি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ডা. আবদুল মান্নানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি মূল নথির অসঙ্গতি এড়িয়ে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন—“আপনাকে কে নিয়োগ দিছে এসব সমস্যা দেখানোর জন্য?” তিনি নিজের বয়স ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

​তদন্তের নামে সাংবাদিকের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা!

​চিকিৎসা-নথির মারাত্মক বৈপরীত্য, কালানুক্রমিক অসামঞ্জস্য এবং তথ্য অধিকার আইনের প্রাতিষ্ঠানিক লঙ্ঘনের বিষয়টি সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন বরাবর দাখিল করা হলে স্বাস্থ্য বিভাগ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. রুবীনা ইয়াসমিনকে সভাপতি করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

​তবে গত ১৩ অক্টোবর তদন্ত কমিটি থেকে ইস্যুকৃত এক চিঠিতে (স্মারক নং: মমেক/প্যাথ/২০২৬/১৬১) অভিযোগকারী অনুসন্ধানী সাংবাদিককে মূল নথিপত্রসহ ভুক্তভোগী ‘রমজান মোল্লা’-কে সশরীরে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

​পরবর্তীতে তদন্ত কমিটির সভাপতি ডা. রুবীনা ইয়াসমিনকে টেলিফোনে প্রশ্ন করা হয়—“নথির গরমিল বের করে প্রতিবেদন দাখিল করা সাংবাদিকের কাজ। কিন্তু ভিকটিমকে খুঁজে বের করা বা হাজির করা সরকারি প্রশাসন ও তদন্ত কমিটির দায়িত্ব। ভিকটিমকে কেন সাংবাদিক আনবেন?” জবাবে তদন্ত কমিটির সভাপতি জানান, আগামী ১৭ অক্টোবর (শনিবার) সিভিল সার্জন কার্যালয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিক একা উপস্থিত হয়েও তাঁর পেশাগত বক্তব্য ও দালিলিক প্রমাণ জমা দিতে পারবেন।

​ক্ষোভ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্ন

​একটি জেলার স্বাস্থ্য প্রশাসনের মূল কেন্দ্রবিন্দু সিভিল সার্জন কার্যালয়। সরকারি কোষাগার থেকে জনগণের করের টাকায় গঠিত পদ ও নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণকারী কর্মকর্তারা থাকতে অনিয়মের তদন্তে ভুক্তভোগীকে খুঁজে বের করার দায় সাংবাদিকের ওপর চাপানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সচেতন মহল মনে করছেন, নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই তদন্ত কমিটি এমন অদ্ভুত নির্দেশ দিয়েছিল।

​এ বিষয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিক শেখ মেহেদী হাসান নাদিম বলেন—“একজন সাংবাদিক হিসেবে নথিপত্রের অসঙ্গতি ও জনস্বার্থের অনিয়ম উন্মোচন করাই আমার পেশাগত কাজ। ভিকটিমকে খুঁজে বের করা বা তদন্ত পরিচালনা করা জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসনের বেতনভুক্ত কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক দায়িত্ব। আমি আমার সংগৃহীত প্রমাণক কমিটির সামনে উপস্থাপন করব, বাকি তদন্তের দায় তাদের।”

​আসন্ন শনিবারের তদন্ত কমিটির শুনানিতে সিবিএমসিবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে কী ব্যাখ্যা আসে এবং স্বাস্থ্য প্রশাসন এই গুরুতর চিকিৎসা-ত্রুটির বিরুদ্ধে কী আইনি ব্যবস্থা নেয়, সেদিকেই এখন সবার নজর।