ভিটেমাটি হারানোর মনস্তত্ত্ব ও শেকড়ছেঁড়ার ইতিহাস (১ম পর্ব)

​শেকড়ছেঁড়ার রাত ও মধ্যবিত্ত-আভিজাত্যের দায়

​শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

​মানুষ জীবনের তাগিদে ঘর বদলায়, জীবিকার প্রয়োজনে স্থানান্তরিত হয়। কিন্তু মানুষ কখন নিজের বাপদাদার ভিটেমাটি, শতাব্দীর পুরোনো ইমারত, পূর্বপুরুষের কবর বা শ্মশান, এবং স্বহস্তে রোপণ করা সুপারি বাগান পেছনে ফেলে ঘোর অন্ধকারের মধ্যে একবস্ত্রে পালিয়ে যায়?

​এই প্রশ্নের উত্তর কোনো সরকারি পরিসংখান বা রাজনৈতিক ভাষণে পাওয়া যায় না। এর উত্তর লুকিয়ে আছে মানবমনের গভীরতম এক আতঙ্কের ভেতর। যখন মানুষের সামনে বেঁচে থাকার শেষ আইনি ও সামাজিক আশ্রয়টুকু ভেঙে পড়ে, যখন প্রতিবেশীর হাসিমুখের পেছনে লোলুপ দৃষ্টি ফুটে ওঠে, এবং যখন নিজের ঘরের নারী ও সন্তানের নিরাপত্তা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে—তখন আভিজাত্য, সম্পদ বা বিশাল ভূসম্পত্তি কোনো সুরক্ষার বর্ম থাকে না; বরং সেটাই হয়ে ওঠে তার প্রধান অপরাধ।

​আভিজাত্যই যেখানে কাল: দরিদ্র বনাম সম্ভ্রান্তদের ত্যাগের বৈপরীত্য

​উপমহাদেশের দেশভাগ এবং পরবর্তী সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নিয়ে যে ইতিহাস চর্চা হয়েছে, তাতে একটি গভীর সামাজিক বিভাজনকে প্রায়শই আড়াল করা হয়। নিবিড় ইতিহাস ও ভূমি-রেকর্ড পর্যালোচনা করলে একটি নির্মম সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে: এই দেশত্যাগের ধাক্কা সমানভাবে সবার ওপর পড়েনি; এটি সবচেয়ে নির্মমভাবে আঘাত করেছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধনী, সম্ভ্রান্ত, শিক্ষিত ও বর্ধিষ্ণু ভূম্যধিকারি পরিবারগুলোর ওপর।

​দরিদ্রদের কেন পালাতে হয়নি?

​সমাজের নিম্নবর্গীয় বা প্রান্তিক মানুষের তাড়িয়ে দেওয়ার পেছনে স্থানীয় লোলুপ চক্রের কোনো অর্থনৈতিক আগ্রহ ছিল না। কারণ, তাঁদের তাড়িয়ে কোনো শতবিঘা জমি, জমিদারির পাকা দালান বা সুপারি বাগান দখলের সুযোগ ছিল না। ফলে, মারাত্মক সামাজিক ঝড়ের মধ্যেও নিঃস্ব মানুষেরা মাটি কামড়ে থেকে যেতে পেরেছিলেন, কারণ তাঁদের কাছে কেড়ে নেওয়ার মতো কিছু ছিল না।

​সম্পদের লোভ ও সম্ভ্রান্তদের উচ্ছেদ:

​অন্যদিকে, টার্গেট করা হয়েছিল সেই পরিবারগুলোকে, যারা ময়মনসিংহসহ বাংলার বিভিন্ন জনপদে নগরায়ণ, শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা ও সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি ছিল। তাঁদের হাজার বিঘার খতিয়ান, সুদৃশ্য বসতবাড়ি, পুকুর ও সামাজিক প্রতিষ্ঠাই তাঁদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাঁদের তাড়িয়ে দিলে রাতারাতি কোটি টাকার সম্পত্তি আত্মসাৎ করা সম্ভব—এই নগ্ন ও প্রকাট লোভই স্থানীয় প্রভাবশালী ও সুযোগসন্ধানী চক্রগুলোকে হিংস্র করে তুলেছিল।

​সেই রাতের মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়

​ময়মনসিংহের কিংবা এই ভূখণ্ডের কোনো এক আভিজাত্যপূর্ণ পরিবারের কথা চিন্তা করুন—যাদের সিংহদরজায় সারাদিন মানুষ সাহায্যের জন্য আসত, যাদের রায় ছাড়া গাঁয়ের সালিশ দরবার পূর্ণ হতো না। সেই পরিবারের প্রধান যখন মধ্যরাতে বুঝতে পারেন যে রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং পুলিশ তাঁর পাশে নেই; যখন তিনি দেখেন এতদিন যাদের ছায়া দিয়ে এসেছেন, সেই পরিচিত মুখগুলোই তাঁর সম্পত্তি ভাগবাটোয়ারা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে—তখন তাঁর আভিজাত্যের সমস্ত অহংকার ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

​সন্তানদের প্রাণ বাঁচাতে এবং ঘরের নারীদের সম্ভ্রম রক্ষা করতে যখন সেই অভিজাত গৃহকর্তাকে রাতের অন্ধকারে চোরের মতো খালি পায়ে ভিটেমাটি ছেড়ে সীমান্তমুখী হতে হয়, সেটি কেবল কোনো স্থানান্তর নয়; সেটি হলো এক জীবন্ত মানুষের আত্মিক ও সামাজিক মৃত্যু।

​কার লাভ ছিল এই উচ্ছেদে?

​রাজনীতিবিদরা একে ‘দেশভাগ’ বা ‘জনসংখ্যা বিনিময়’ বলে চটকদার নাম দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে এর পেছনে কাজ করেছিল এক আদিম লুণ্ঠনপ্রবৃত্তি। ভিনদেশি শাসক এসে স্থানীয় সম্ভ্রান্ত সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলোর ঘরবাড়ি দখল করেনি। তা করেছিল তাঁদেরই প্রতিবেশী, স্থানীয় উদীয়মান রাজনৈতিক সুবিধাভোগী এবং ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থাকা ভূমিগ্রাসী চক্র।

​যে আভিজাত্য একসময় সমাজের আলো ছিল, সম্পদের লোভের কারণে সেই আভিজাত্যকেই পরিকল্পিতভাবে উপড়ে ফেলা হলো। আর এর মধ্য দিয়ে একটি ভূখণ্ড কেবল তাঁর সম্পদশালী অধিবাসীদের হারালো না, বরং হারালো তার শিক্ষা, সংস্কৃতি, নেতৃত্ব এবং বহুত্ববাদী সমাজের আত্মাকে।

​(চলবে… পরবর্তী পর্ব: নামের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস (ময়মনসিংহের প্রেক্ষাপট))