শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

ময়মনসিংহ নগরীর দুর্গাবাড়ি রোড এলাকায় অর্পিত ‘ক’ তফসিলভুক্ত শত কোটি টাকা মূল্যের সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানাধীন রেকর্ডে ঢুকিয়ে দিয়ে ৩টি বহুতল ভবন নির্মাণের নেপথ্যে তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কার্যালয়ের সরাসরি অপরাধমূলক গাফিলতি ও রেকর্ড জালিয়াতির অকাট্য তথ্য মিলেছে। তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) এইচ এম ইবনে মিজান কর্তৃক স্বাক্ষরিত ও সত্যায়িত বি.আর.এস. ১ নং সরকারি খতিয়ান এবং জেলা জজ আদালতের সার্টিফাইড কপির দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে এই গুরুতর প্রশাসনিক অপরাধের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
সংঘটিত সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক অপরাধসমূহ:
- ১ নং সরকারি খতিয়ান বিলোপ ও জালিয়াতি: সরকারি ১ নং খতিয়ানের (পৃষ্ঠা ১৮৫ ও ১৯৬) আওতায় থাকা খাস জমি ও অর্পিত সম্পত্তি সুরক্ষার আইনি দায়িত্ব ছিল সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের। কিন্তু সাবেক এসি (ভূমি) এইচ এম ইবনে মিজানের সত্যায়িত নথিতে দেখা যায়, সরকারি ১/১ খতিয়ান ও ডি.পি. ১৫২৫ খতিয়ানের জমিকে রেকর্ড সংশোধনের নামে ব্যক্তিমালিকানাধীন দাগে একীভূত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
- সাবেক ও বি.আর.এস. দাগ জালিয়াতিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ: সাবেক এস.এ. ৬১৯০, ৬১৯২, ৬১৯৮ ও ৬১৯৯ নম্বর দাগের সরকারি অর্পিত ‘ক’ তফসিলভুক্ত ০.১৮৯০ একর জমিকে বি.আর.এস. ৩৪৭৪ নম্বর দাগে (মোট ০.৪৫৬০ একর) রূপান্তরের সময় সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় কোনো আপত্তি (Objection) উত্থাপন করেনি এবং রেকর্ড নামজারি প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছে।
- অবৈধ ১১ তলা ভবন নির্মাণে নীরব ভূমিকা (সরকারি অর্পিত সম্পত্তি আইন লঙ্ঘন): কোনো লিজ বা সরকারি অনুমতি ছাড়াই ২০২২ সাল থেকে বি.আর.এস. ৩৪৭৪ দাগে তিনটি ১১ তলা ভবন গড়ে উঠলেও তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) কোনো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেননি বা ফৌজদারি মামলা দায়ের করেননি, যা সরকারি সম্পত্তি রক্ষা আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন ও দায়িত্বে চরম অবহেলা।
- মিথ্যা/গরমিল তথ্য সত্যায়ন: জেলা জজ আদালতের সার্টিফাইড কপি ও ভূমি অফিসের মূল সরকারি রেকর্ডের সাথে বাস্তবে বি.আর.এস. রেকর্ডের যে অমিল ধরা পড়েছে, সেই বিতর্কিত খতিয়ান নথি যাচাই ছাড়াই সত্যায়িত (Attest) করে আইনি বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থার মুখোমুখি:
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ১ নম্বর খতিয়ানের সম্পত্তি কোনো ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়ার বা তা দেখে নীরব থাকার কোনো সুযোগ নেই। সরকারি জমি জালিয়াতিতে সহায়তা করায় সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা এবং দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০ ধারা (বিশ্বাসভঙ্গ ও জালিয়াতি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনের আওতায় তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) সহ সংশ্লিষ্ট রেকর্ড সংশোধনকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও ফৌজদারি মামলা দায়েরের পর্যাপ্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
গত ০৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নির্ধারিত শুনানিতে এই সাবেক এসি (ভূমি)-এর স্বাক্ষরিত বিতর্কিত খতিয়ান নথি এবং আদালতের সার্টিফাইড কপি সরাসরি উপস্থাপন করা হয়েছে। ভূমি রেকর্ড জালিয়াতি এবং সরকারি সম্পত্তি দখলের এ ধরনের গুরুতর অনিয়ম ও অপরাধ প্রমাণিত হলে অতীতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষা ও সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের একাধিক দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক ও বিচারিক নজির রয়েছে।