সড়ক ও মহাসড়ক দখলমুক্ত করতে প্রয়োজন জাতীয় সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা

লায়ন মো: গনি মিয়া বাবুল

দেশের সড়ক ও মহাসড়কের উভয় পাশে গড়ে ওঠা অস্থায়ী হাট-বাজার, দোকানপাট এবং নানাবিধ অবৈধ স্থাপনা আজ এক জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এই অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিদিন বাড়ছে যানজট, অকাল মৃত্যু ও সীমাহীন জনদুর্ভোগ। সড়ক ব্যবস্থাপনার এই অরাজকতা দ্রুত সমাধান করা না হলে অদূর ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

ইজারা ও প্রশাসনিক জটিলতা

মহাসড়কগুলো সাধারণত সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) অধিগ্রহণকৃত জমির ওপর অবস্থিত। কিন্তু দেখা যায়, সওজ-এর জায়গায় বাজার বসিয়ে অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন সওজ-এর অনুমতি ছাড়াই ইজারা প্রদান করছে। ফলে মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে, যা কয়েক কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। সম্প্রতি গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম এই সমস্যা নিরসনে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার বরাবর পত্র প্রেরণ করেছেন। তিনি জাতীয় মহাসড়কের পাশে অস্থায়ী বাজারের ইজারা স্থগিত বা বাতিল করার যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত ও প্রশংসনীয়।

অর্থনীতি ও শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব

সড়ক দখলের কারণে শুধু সাধারণ যাত্রীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, বরং দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পখাতেও এর বড় প্রভাব পড়ছে। যানজটের কারণে পণ্যবাহী ট্রাক সময়মতো বন্দরে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের কার্যাদেশ বাতিল হচ্ছে এবং শিল্প মালিকরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এছাড়া কর্মজীবী মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা সড়কেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা জাতীয় উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে।

দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও জনস্বাস্থ্য

রাস্তার মাঝখানে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় এবং এলোমেলো পার্কিং চালকদের নিয়ন্ত্রণ হারানো অন্যতম কারণ। বিশেষ করে রাতে অপর্যাপ্ত আলো ও অব্যবস্থাপনায় প্রাণহানির ঘটনা অহরহ ঘটছে। এছাড়া সড়কের ওপর হাট-বাজার বসায় অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাদ্য বিক্রি হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে সড়কের পাশে ময়লা জমে দুর্গন্ধ ও রোগব্যাধি ছড়াচ্ছে।

সমাধানের পথ: উচ্ছেদ নয়, প্রয়োজন পুনর্বাসন

শুধুমাত্র উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কারণ উচ্ছেদের কিছুদিন পর পুনরায় দখল হয়ে যায়। এর স্থায়ী সমাধানে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি:

  • বাজার স্থানান্তর: সড়কের ধারের বাজারগুলোকে নির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত জায়গায় স্থানান্তর করতে হবে।
  • সমন্বিত টাস্কফোর্স: সড়ক বিভাগ, পুলিশ, সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।
  • কঠোর মনিটরিং: ডিজিটাল মনিটরিং ও সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
  • বিকল্প ব্যবস্থা: ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে বিকল্প দোকান বরাদ্দ করতে হবে যাতে তারা জীবিকার তাগিদে সড়ক দখল করতে বাধ্য না হয়।

সড়ক কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি রাষ্ট্রের সম্পদ এবং সবার চলাচলের অধিকার। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা—এই তিনের সমন্বয়েই একটি নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে ফুটপাত বা সড়ক দখল করে কেনাকাটা থেকে বিরত থাকা। সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সড়কের শৃঙ্খলা ফিরে আসবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *