অনিয়ম যখন নিয়মে পরিণত: জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্র ও সমাজের চিত্র
মোহাম্মদ উল্যা, নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি

রাষ্ট্র ও সমাজের নানা স্তরে অনিয়ম, ঘুষ এবং স্বার্থনির্ভর ক্ষমতার বলয় নতুন কিছু নয়। তবে জুলাই-পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল—পরিবর্তনের হাওয়া জোরালো হবে, প্রশাসন ও রাজনীতিতে ইতিবাচক মানসিকতার দৃশ্যমান রূপ দেখা যাবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, কাঠামোগত দুর্বলতা ও কায়েমি স্বার্থের দাপটে পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রেই প্রায় অপরিবর্তিত। মেকি সালিশ-বাণিজ্য, ঘুষ, সুদি কারবার ও অনৈতিক তদবিরের মিশেলে অনিয়ম যেন আজ নিয়মে পরিণত হয়েছে।
সালিশ ও তদবির-বাণিজ্যের নেপথ্যে
গ্রাম থেকে শহর—বিরোধ নিষ্পত্তির নামে সালিশ এখন অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক লেনদেনে রূপ নিচ্ছে। প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদে ‘ফয়সালা’ বিক্রি হচ্ছে; ন্যায়ের বদলে চলছে ক্ষমতার হিসাব। একই সঙ্গে অনৈতিক তদবির-বাণিজ্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। যোগ্যতা নয়, বরং সম্পর্ক ও লেনদেন যখন নির্ণায়ক হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়স্থলটুকুও নড়বড়ে হয়ে যায়।
ঘুষ ও সুদি কারবারের থাবা
‘কোথায় নেই ঘুষ?’—প্রশ্নটি আজ জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেবা নিতে গেলে অঘোষিত ফি যেন বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে, সুদি কারবার দরিদ্র ও মধ্যবিত্তকে ঋণের ফাঁদে আটকে সামাজিক বৈষম্য বাড়াচ্ছে। রাষ্ট্রীয় নজরদারি দুর্বল হওয়ার সুযোগে এই গোষ্ঠীগুলো আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা
রাজনৈতিক দলের শক্তি গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু যখন তা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাকে গ্রাস করে, তখন সুশাসন ব্যাহত হয়। অভিযোগ রয়েছে, পুরোনো আধিপত্যবাদী কায়েমি গোষ্ঠীর পক্ষে প্রশাসনের একাংশ এখনো সক্রিয়। বদলির ভয়, পদোন্নতির হিসাব কিংবা সুবিধাভোগী নেটওয়ার্কের কারণে সিদ্ধান্তে পক্ষপাত ঢুকে পড়ছে, যা সংস্কারের গতিকে মন্থর করছে।
কেন থমকে আছে পরিবর্তন?
জুলাইয়ের পর আশা ছিল আইনের শাসন দৃঢ় হবে। কিছু উদ্যোগ দেখা গেলেও সার্বিক পরিবর্তন এখনো অধরা। এর প্রধান কারণগুলো হলো: ১. দীর্ঘদিনের কায়েমি স্বার্থ ভাঙার রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি। ২. প্রশাসনে প্রণোদনা ও শাস্তির ভারসাম্যহীনতা। ৩. স্বচ্ছতা ও ডিজিটালাইজেশনের অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন। ৪. বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি।
উত্তরণের পথ
এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে বদলি ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছ মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। ডিজিটাল সেবা বিস্তারের মাধ্যমে ঘুষের সুযোগ কমাতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে তথ্যভিত্তিক সমালোচনা ও নজরদারি চালিয়ে যেতে হবে। জুলাই-পরবর্তী সময় আমাদের সামনে সুযোগ এনেছে কথার বাইরে কাজে নামার। অনিয়মকে নিয়মে পরিণত হতে না দিয়ে ন্যায়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পথে হাঁটলেই কেবল কায়েমি স্বার্থের দুষ্টচক্র ভাঙা সম্ভব। পরিবর্তন কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়—প্রশ্ন কেবল, আমরা কি সেই সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত?
