স্টাফ রিপোর্টার

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। পাবনার ঈশ্বরদীতে বাস্তবায়নাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু ও পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সব নিরাপত্তা পরীক্ষা অনুমোদিত হওয়ায় চলতি নভেম্বর মাসেই প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে জাতীয় গ্রিডে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
কারিগরি অগ্রগতি ও উৎপাদনে যাওয়ার প্রক্রিয়া
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ইউনিটে অগ্নিনিরাপত্তা, তেজস্ক্রিয়তা এবং উচ্চ চাপে নিরাপত্তা ভালভের বিভিন্ন মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা সম্পন্ন করে জমা দেওয়া হয়েছিল, যা সম্প্রতি অনুমোদিত হয়েছে। এর ফলে চুল্লির ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ বা নিয়ন্ত্রিত স্বনির্ভর পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরুর পথ সুগম হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হবে। ধাপে ধাপে চুল্লির তাপ উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়ে কারিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে বাণিজ্যিক উৎপাদনের দিকে যাওয়া হবে।
প্রযুক্তি, সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি অবদান
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন ‘রোসাটম’-এর কারিগরি সহায়তায় তৈরি এই কেন্দ্রে আধুনিক তৃতীয় প্রজন্মের ‘ভিভিইআর-১২০০’ (VVER-1200) প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।
- উৎপাদন সক্ষমতা: প্রতিটি ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট চালু হলে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করবে।
- স্থায়িত্ব ও রিফুয়েলিং: বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রাথমিক আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ৬০ বছর, যা পরবর্তীতে আরও ২০ থেকে ৩০ বছর বাড়ানো সম্ভব। এছাড়া প্রতি দেড় বছর (১৮ মাস) পরপর নতুন ইউরেনিয়াম জ্বালানি দেওয়া এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হবে।
অর্থনৈতিক ও শিল্প বিকাশে রূপপুরের ভূমিকা
পারমাণবিক শক্তিতে কয়লা বা গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়াতে হয় না বলে এটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করে। বর্তমান সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ ও আমদানিনির্ভরতা কমানোর যে পরিকল্পনা নিয়েছে, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সেই লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বাসসকে জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। ২,৪০০ মেগাওয়াট মানসম্পন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে তা কেবল শিল্পকারখানার উৎপাদন সক্ষমতাই বাড়াবে না, বরং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশজুড়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ও রোসাটমের সার্বিক কারিগরি সহায়তায় দ্রুতগতিতে দেশের এই বৃহত্তম মেগাপ্রকল্পটি বাস্তবায়নের চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছেছে।