রমজান অর্থনীতি: মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতার সংকট

মো: মাসুদ মিয়া

সংযম, আত্মশুদ্ধি ও সহমর্মিতার মাস পবিত্র রমজান। এ মাস মানুষকে কেবল উপবাসের শিক্ষাই দেয় না; দেয় ন্যায়বোধ, মিতব্যয়িতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা। অথচ বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রায় প্রতিবছরই রমজান এলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। চাল, ডাল, তেল, চিনি থেকে শুরু করে ইফতারের কাঁচামরিচ ও লেবু—অধিকাংশ পণ্যের দামই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। আধ্যাত্মিক প্রশান্তির মাস তখন অনেকের জন্য পরিণত হয় আর্থিক উদ্বেগের মাসে।

টিসিবির ট্রাকসেল: ৩শ টাকার জন্য ৩ ঘণ্টার সংগ্রাম

বাজারের ঊর্ধ্বগতি মোকাবিলায় ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) সারা দেশে ৪৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। ৫৯০ টাকার একটি প্যাকেজে একজন ক্রেতার খোলা বাজারের তুলনায় প্রায় ৩০০ টাকার বেশি সাশ্রয় হচ্ছে। কিন্তু এই সামান্য সাশ্রয়ের আশায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ ভোর থেকে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে হুড়োহুড়ি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। গত কয়েক বছরে জ্বালানি, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও বাসাভাড়ার ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে আয় বাড়লেও তা দ্রব্যমূল্যের সাথে পাল্লা দিতে পারছে না।

বাজার সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকট

রমজানকে কেন্দ্র করে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ‘সিন্ডিকেট’ ও কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে সরবরাহ আটকে রাখা বা অজুহাতে দাম বাড়ানো কোনোভাবেই নৈতিক নয়। রমজানের প্রথম ১০ দিন কাঁচামাল ব্যবসায়ী, মাঝের ১০ দিন কাপড়ের ব্যবসায়ী এবং শেষ ১০ দিন পরিবহন সেক্টর—বাজার যেন এই তিন চক্রের দখলে চলে যায়। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা বা জরিমানা করে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ এলেও, সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার অপরিহার্য।

‘ফ্যামিলি কার্ড’: সামাজিক সুরক্ষার নতুন দিগন্ত

এই সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের অন্যতম রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি আগামী ১০ মার্চ ২০২৬ থেকে চালু হতে যাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ১৪টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে এটি শুরু হবে। মাসে ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরাসরি সুবিধাভোগী পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক কেন্দ্রীয় ডেটাবেস ব্যবহার করা হচ্ছে, যা প্রকৃত দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা যায়।

রাষ্ট্রের করণীয় ও আমাদের দায়

শুধু টিসিবির ট্রাকসেল বা সাময়িক ভর্তুকি স্থায়ী সমাধান নয়। টেকসই সমাধান পেতে হলে:

  • খাদ্যপণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।
  • কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে মুনাফার মার্জিন নিরীক্ষা করতে হবে।
  • তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
  • ব্যবসায়ী সমাজকে নীতিবোধের পরিচয় দিতে হবে।

রমজান কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি নৈতিকতার পরীক্ষা। রাষ্ট্র, ব্যবসায়ী ও নাগরিক—এই তিন পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই বাজারে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব। রমজানের প্রকৃত চেতনা তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন কোনো পরিবারকে ইফতারের টেবিলে বসার আগে হিসাব কষতে হবে না—আজ ডাল কিনবে নাকি তেল। ন্যায্য বাজারব্যবস্থা কেবল অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিকতার প্রশ্ন।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *