‘যদি’র বেড়াজাল ছিঁড়ে ফেলুন রাষ্ট্রই আপনাকে সিংহাসনে বসাতে প্রস্তুত

শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

সম্পাদকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি – জাহান।

একজন মুমূর্ষু রোগীর মুখের সামনে অক্সিজেন মাস্ক ধরে কোনো ডাক্তার কি বলতে পারেন—“তুমি আগে আমাকে দায়িত্ব দাও, তবেই আমি তোমাকে বাঁচাব, নইলে নয়?” আজকের বাংলাদেশ ঠিক সেই মুমূর্ষু রোগী। বাঁচার প্রশ্নে এখানে কোনো শর্ত চলে না।

যে প্রয়োজনীয় রূপরেখা আপনি আজ দিয়েছেন, তা কোনো বিলাসিতা নয়—এগুলো এই মৃতপ্রায় জাতির লাইফ-সাপোর্ট বা অক্সিজেন। কিন্তু এই অক্সিজেনের সাথে যখন ‘ক্ষমতায় যাওয়া’র শর্ত জুড়ে দিয়ে বলা হয়, “ইনশাআল্লাহ আমরা যদি সরকার গঠন করতে পারি…”, তখন তা পেটের ভাতের সাথে শর্ত জুড়ে দেওয়ার মতোই শোনায়, যা এক প্রকার উপহাস।

আজকের বাংলাদেশ এক জরাজীর্ণ, দুর্দশাগ্রস্ত সিঙ্গাপুরের মতো হয়ে গেছে, কিংবা তার চাইতেও আরও নিচুতে নেমে গেছে। আমি আমার লেখার প্রথম পর্বে স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছিলাম—এই ধসে পড়া জনপদকে টেনে তুলতে আমাদের কোনো গতানুগতিক পলিটিশিয়ানের প্রয়োজন নেই, আমাদের প্রয়োজন একজন ‘লি কুয়ান ইউ’। যিনি সিঙ্গাপুরের মতো একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে শক্ত হাতে গড়ে তুলেছিলেন। সেই লি কুয়ান ইউ-এর আদলে রাষ্ট্র গড়তে হলে প্রথমেই প্রয়োজন কঠোর শৃঙ্খলা।

জনাব তারেক রহমান, সারাদেশের নেতাকর্মীদের দয়া করে বলুন—শত শত মোটরসাইকেল নিয়ে বিকট শব্দে হর্ন বাজিয়ে, কৃত্রিম সাইলেন্সারের বিশ্রী শব্দে পরিবেশ দূষিত করে ক্ষমতার দাম্ভিকতা প্রদর্শন করা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। নেতাকর্মীদের মাধ্যমে জনগণের মনে ভীতি অনুপ্রবেশ করানোর এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা আজ ‘ফরজ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে রাখবেন, বাংলাদেশ আজ এক মুমূর্ষু রোগী; এই রোগীর কানের পাশে ভয়ের শব্দ আর চোখের সামনে শত শত মোটরসাইকেলের মহড়া নয়, দরকার স্নেহের দৃষ্টি আর অভয়ের অক্সিজেন।
কোনো বাঙালিই আজ আপনার কাছে গতানুগতিক নির্বাচনী বুলি বা রূপরেখা শুনতে চায় না। শুনতে চায় ১৭ বছরের দহনে পোড়া এক আগুনের পরশমণির ছোঁয়ায় রূপান্তরিত সেই লি কুয়ান ইউ-এর মতো মহানায়কের কণ্ঠস্বর। 

বিগত ১৭ বছরকে কেবল ‘নির্বাসন’ বা প্রবাস জীবন বলা চলে না; বরং এটি ছিল একজন নেতার নিজেকে প্রস্তুত করার, নিজেকে ‘সিজনিং’ করার এক দীর্ঘ কালপর্ব। খাদহীন খাঁটি সোনায় পরিণত হতে হলে যেমন স্বর্ণখণ্ডকে আগুনের তীব্র দহনে পুড়তে হয়, ঠিক তেমনি আপনিও গত দেড় যুগে সেই দহনে পুড়ে আজ খাঁটি হয়ে স্বদেশে ফিরেছেন। রক্তে কেনা এই বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে আজ যখন আপনি কথা বলছিলেন, তখন গোটা জাতি রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে ছিল এক ইস্পাতকঠিন দেশপ্রেমিকের দিকে। অথচ আজকের এই ভস্মীভূত, ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আপনার বক্তব্যে ওই একটি শব্দ—‘যদি’—আমাদের বুকে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে।

জনাব তারেক রহমান, ‘হয়তো’, ‘যদি’, ‘মনে করি’, ‘সম্ভবত’, ‘হতে পারে’—এই  শব্দগুলো মানায় কেবল সেইসব মেরুদণ্ডহীন পলিটিশিয়ানদের মুখে, যারা নিজের গদি নিয়ে শঙ্কিত। কিন্তু অগ্নিশুদ্ধ হয়ে ফিরে আসা আপনার মতো নেতার মুখে এই শব্দগুলো একেবারেই বেমানান। যে নেতাকে জাতি ‘ঝড়ের রাতের কাণ্ডারি’ হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে, তাঁর অভিধানে এই নড়বড়ে শব্দগুলোর কোনো স্থান থাকতে পারে না। 

আজ একটি বড় সত্য উপলব্ধি করা প্রয়োজন—বিএনপির কোটি কোটি নেতাকর্মী আপনাকে ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে দেখতে চায়, এটা তাদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু আপামর বাঙালির চাওয়া আরও অনেক উঁচুতে। গোটা বাঙালি চায়—বিএনপির প্রতিটি সদস্যসহ গোটা বাঙ্গালী জাতি আপনাকে নিয়ে গর্বিত বোধ করুক। জাতি আপনাকে কোনো ‘পদ’-এ নয়, দেখতে চায় জাতির ‘ত্রাণকর্তা’-এর আসনে। দলের চাওয়ার মধ্যে আছে ‘ক্ষমতা’, কিন্তু বাঙালির চাওয়ার মধ্যে আছে ‘মুক্তি’

আজ কোথাও নতুন করে পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই, পরিবর্তন কেবল একটি জায়গাতেই প্রয়োজন—সেটি হলো আপনার সিদ্ধান্তের! ওই ‘যদি’র সংশয় ঝেড়ে ফেলে ‘দৃঢ়তা’ আনতে হবে। মনের ভেতরের এই দ্বিধা দূর করুন! আগামীকাল সকাল থেকেই দেখবেন রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে সেই পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেই তার প্রয়োজনে আপনাকে খুঁজে নেবে।

তাই আজ থেকে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিন এবং অন্তরের দৃঢ়তা অনুভব করুন। নিজের মধ্যে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই ‘বাঘের সত্তা’ অনুভব করুন। এমন এক হুঙ্কার উচ্চারণ করুন—যাতে দুর্নীতির সব কুশীলব লেজ গুটিয়ে পালায়। এমন গর্জন করুন—যার ফলে গোটা ক্যান্টনমেন্ট  মনিরুলের মতো অপরাধী কোনো পুলিশ সদস্যকে আশ্রয় দেওয়ার সাহস না পায়। 

আপনি ক্ষমতা চাইবেন কেন? রাষ্ট্রই আজ তৃষ্ণার্ত হয়ে আপনাকে ক্ষমতায় বসাতে চাইছে। জাতি বুঝেছিল, ঝড়ের রাতে একজন ত্রাণকর্তা এসেছেন। আজকের মৌনতা বা বিনয় দিয়ে সেই অর্জনকে ম্লান করবেন না। আপনি শুধু নিজেকে ‘বিদ্রোহী বীর’ হিসেবে প্রস্তুত করুন। আপনাকে কোথায়, কীভাবে, কোন সম্মানের আসনে বসাতে হবে—কীভাবে আপনার হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা তুলে দিতে হবে, তার গ্যারান্টি দিচ্ছে দেশের ১৭ কোটি মানুষ। আজ থেকে আর কোনো ‘যদি’ নয়, কেবল জয়ের নিঃশর্ত গ্যারান্টি দিন!

About The Author

One thought on “‘যদি’র বেড়াজাল ছিঁড়ে ফেলুন রাষ্ট্রই আপনাকে সিংহাসনে বসাতে প্রস্তুত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *