মেঘনার গ্রাসে বিলীন হচ্ছে হাতিয়া: ঘরবাড়ি, স্কুল ও স্বপ্ন হারানো মানুষের আর্তনাদ

মোহাম্মদ উল্যা, নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি

মেঘনা নদী আর হাতিয়া—একদিকে জীবনের উৎস, অন্যদিকে ধ্বংসের এক নির্মম উপাখ্যান। এক সময়ের আশীর্বাদ এই নদীই এখন কেড়ে নিচ্ছে মানুষের ভিটেমাটি, সাজানো সংসার আর পূর্বপুরুষের শেষ স্মৃতিটুকু। প্রতিদিন ভাঙনের আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটছে হাতিয়ার কয়েক লাখ উপকূলীয় মানুষের।

মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে জনপদ

হাতিয়ার হরনী, চানন্দী, সুখচর, নলচিরা, বুড়িরচর, সোনাদিয়া ও নিঝুমদ্বীপ—এই নামগুলো এখন কেবল মানচিত্রের অংশ নয়, হয়ে উঠেছে হাজারো মানুষের কান্না আর বেদনার প্রতীক। বিশেষ করে নলচিরা, সুখচর ও চানন্দী ইউনিয়ন বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, স্বাধীনতার পর থেকে অব্যাহত ভাঙনে কয়েক হাজার ঘরবাড়ির পাশাপাশি শত শত মসজিদ, মাদ্রাসা ও স্কুল নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

অনিশ্চয়তায় শত শত শিশুর শিক্ষাজীবন

নদীভাঙনের করাল গ্রাস থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও। গত কয়েক বছরে অন্তত ১০টির বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় মেঘনায় তলিয়ে গেছে। বর্তমানে জনতাবাজার, ফরিদপুর বাজার এবং হেমায়েতপুর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে। চানন্দী ইউনিয়নের ইসলামপুর দাখিল মাদ্রাসাটি সম্প্রতি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ ও আর্তনাদ

নলচিরা ইউনিয়নের বৃদ্ধ নুরুল ইসলাম কাঁপা গলায় বলেন, “এই ঘরেই আমার জন্ম, এখানেই বিয়ে। নদী সব নিয়ে গেছে, এখন মরার জায়গাটুকুও নেই।” সুখচর ইউনিয়নের ইসমাইল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ভোট এলে নেতারা প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু আমাদের ভাগ্য বদলায় না। নদীভাঙনের কোনো স্থায়ী সমাধান হয় না।” নিঝুমদ্বীপের বাসিন্দাদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর নদীশাসন ও শক্তিশালী বেড়িবাঁধ নির্মাণ না করলে একদিন নিঝুমদ্বীপ মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যেতে পারে।

স্থায়ী সমাধান চায় উপকূলবাসী

স্থানীয়দের অভিযোগ, জিওব্যাগ ফেলা বা অস্থায়ী বাঁধ মেঘনার তীব্র স্রোতের সামনে টিকছে না। সাময়িক ত্রাণ নয়, বরং টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদী বাঁধ নির্মাণের দাবি তুলেছেন দ্বীপবাসী।

উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে টেকসই বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে। তবে প্রশ্ন একটাই—সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে হতে হাতিয়ার আর কত স্বপ্ন মেঘনায় তলিয়ে যাবে?

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *