মোহাম্মদ উল্যা, নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি

কোনো দলই শতভাগ সত্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। সত্য কখনো একদলীয় সম্পত্তি হতে পারে না, যেমন আকাশ কোনো এক দেশের নয়। মানুষ দল করে কেউ বিশ্বাসে, কেউ অভ্যাসে, আবার কেউ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া শিক্ষায়। আপনি যে দল করেন, তা আপনার উপলব্ধি কিংবা অর্জিত জ্ঞানের ফল; সেটি আপনার ব্যক্তিগত পথচলা। কিন্তু রাজনীতি যখন বিশ্বাসের সীমা ছাড়িয়ে অন্ধ আনুগত্যে পরিণত হয়, তখন তা চিন্তার স্বাধীনতাকে গ্রাস করে ফেলে।
রাজনীতি : এক বিশাল নাট্যমঞ্চ
রাজনীতি অনেকের কাছে নেশা, কারও পেশা, কারও কাছে আবার এক প্রকার ফরজ দায়িত্ব। নিরপেক্ষ চোখে দেখলে এটি এক বিশাল নাট্যমঞ্চের মতো। সেখানে নায়ক আছে, ভিলেন আছে, সহচর আছে, এমনকি বিশ্বাসঘাতকেরও আনাগোনা আছে। নাটকের মতোই এখানে সংলাপ আছে, আবেগ আছে, উল্লাস আছে, আবার বেদনা ও ট্র্যাজেডিও আছে। টেলিভিশন টকশো থেকে শুরু করে মিছিলের স্লোগান কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তর্ক-বিতর্ক—সবই যেন এক চলমান মঞ্চায়ন।
পাঁচ বছরের চক্র ও বাস্তবতা
দর্শক হিসেবে আমরা হাসি, কাঁদি, ক্ষুব্ধ হই। কিন্তু নাটকের মতো এখানেও একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে—পাঁচ বছর। এই চক্রে দৃশ্য বদলায়, চরিত্র বদলায়, কিন্তু মঞ্চটি একই থাকে। এই রাজনৈতিক নাটকের নেপথ্যে থাকে বণিক শ্রেণি, স্বার্থের হিসাব আর ক্ষমতার লেনদেন। অনেকেই এই নাটকে শিল্পী হয়ে ওঠেন কেউ করতালির আশায়, কেউ টিকে থাকার তাগিদে। কারও জন্য এটি রুটি-রুজির পথ, কারও জন্য সামাজিক অবস্থান।
যেখানে নাটক আর বাস্তবতা ভিন্ন
সাধারণ নাটকের সাথে রাজনীতির বড় পার্থক্য হলো—নাটক শেষ হলে অভিনেতারা বাড়ি ফিরে যান, কিন্তু রাজনৈতিক নাটকে আহত-নিহতের বাস্তবতা থেকে যায়। এখানে রক্ত সত্যিকারের, কান্না বাস্তব। তাই এই নাটক নিছক বিনোদন নয়, বরং বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। আমরা অনেক সময় দর্শক না হয়ে নিজের অজান্তেই হয়ে যাই সংলাপের বাহক। প্রশ্ন জাগে, তবে কি আমরা এক অপরিপক্ক জাতি, যারা কেবল আবেগে ভেসে যায়?
নাগরিক বোধের প্রয়োজনীয়তা
রাজনীতি আমাদের জীবনযাত্রার অংশ, রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য প্রক্রিয়া। কিন্তু যখন তা অন্ধ সমর্থন আর বিভাজনের নাটকে রূপ নেয়, তখন তা আমাদের মানবিক বোধকে ক্ষয় করে। তবে আশা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। যদি আমরা দর্শক হয়ে কেবল করতালি না দিয়ে সমালোচনামূলক বোধে দেখি, যদি আমরা চরিত্র না হয়ে সচেতন নাগরিক হই—তবেই এই নাট্যমঞ্চ একদিন সত্যিকার গণতন্ত্রের মঞ্চে রূপ নেবে। যেখানে ‘নায়ক’ হবে নীতি, ‘ভিলেন’ হবে অন্যায়, আর ‘প্রেমিকা’ হবে সত্য।
রাজনীতি বাস্তবতা; তাকে কেবল নাটক ভেবে অবহেলা করলে চলবে না। প্রয়োজন সচেতন অংশগ্রহণ, পরিণত বোধ এবং নৈতিক সাহস। তাহলেই হয়তো এই আজব নাটক একদিন সুন্দর বাস্তবতায় রূপান্তরিত হবে।
