পঙ্গু সন্তানের শিয়রে বিদীর্ণ হৃদয়ের এক মা: পিজি হাসপাতালের সেই অভিশপ্ত বিকেল ও বেইমানির মহাকাব্য
শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

পিজি হাসপাতালের সেই নিস্তব্ধ করিডোর আজও এক মা আর তাঁর নাড়িছেঁড়া ধনের বুকফাটা হাহাকারের সাক্ষী হয়ে আছে। পাহারাবেষ্টিত সেই স্যাঁতস্যাঁতে কক্ষের ভেতর যখন মা বেগম খালেদা জিয়া প্রবেশ করলেন, তখন হাসপাতালের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল এক অসহ্য যন্ত্রণায়। সামনে পড়ে আছেন তাঁর আদরের সন্তান তারেক রহমান—কিন্তু এ কোন তারেক? প্রচণ্ড নির্যাতনে বিধ্বস্ত, পঙ্গুপ্রায় এক মানুষ, যাঁর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে নিষ্ঠুর পৈশাচিকতায়। মা আর ছেলের সেই প্রথম দেখায় কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না; ছিল কেবল এক জোড়া চোখ থেকে অন্য জোড়া চোখে বয়ে যাওয়া নোনা জলের অবিরাম ধারা।
নিষ্ঠুরতার বিলম্বিত হিসাব ও গ্রেপ্তারের নেপথ্য
২০২৬ সালের ২৪শে মার্চ জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেপ্তার কেবল একটি আইনি সংবাদ নয়, বরং এটি সেই রুদ্ধদ্বার প্রকোষ্ঠে চলা অমানুষিক নিষ্ঠুরতার এক বিলম্বিত হিসাব। ১/১১-এর সেই কুশীলবরা যখন ‘ডকট্রিন অফ নেসেসিটি’র আড়ালে ক্ষমতার নীল নকশা বুনছিল, তখন এই ভয়াবহ অসহায়ত্বের মুখোমুখি হয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান। জেনারেল মাসুদ কি একটিবারের জন্যও ভেবেছিলেন তাঁর পিতৃপরিচয়ের কথা? তিনি কি জানতেন না যে ‘পাপ ছাড়ে না বাপকে’—এই প্রবাদটি কেন এ দেশে ঐতিহাসিকভাবে সত্য? উর্দির আড়ালে নিজেকে অমর ভেবে তিনি যে নরকের রাস্তা পরিষ্কার করেছেন, তার দায়ভার তাঁর পরবর্তী প্রজন্মকেও বয়ে বেড়াতে হবে। আজ তাঁর নাম যাদের মোবাইলে সেভ করা আছে, তারাও হয়তো নিজেদের অপরাধী বোধ করছেন তাঁর মতো একজনের সাথে পরিচয় থাকার কারণে।নিজের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব—সবাইকে তিনি এক নিমিষে ইতিহাসের ঘৃণিত পাত্রে পরিণত করে দিয়ে গেলেন।
মীর জাফরের উত্তরসূরি ও বেইমানির নোনা স্বাদ

যাদের হুকুমে তিনি এই বর্বরোচিত কর্মকাণ্ড চালিয়েছিলেন, আজ তারা কোথায়? তাঁর এই চেহারা দেখে দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করতে হয় না যে তিনি কোন পর্যায়ের হুকুমের গোলাম ছিলেন। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, বেইমান জাফর আলীর রক্ত যার ধমনীতে বয়, তার চোখে কোনোদিন জল আসে না। তার চোখে থাকে কেবল বিশ্বাসঘাতকতার নোনা স্বাদ। সেদিন সেই অসহায় মায়ের কান্নায় মাসুদের মন গলেনি, কারণ হুকুমের গোলামি করতে গিয়ে তিনি নিজের আত্মাকে অনেক আগেই শয়তানের কাছে বন্ধক দিয়েছিলেন।
মেরুদণ্ড ভাঙার নীল নকশা ও বিচারিক সংস্কার
আজও যখন জনসমক্ষে জনাব তারেক রহমানের চলাফেরা কিংবা কোনো সূক্ষ্ম আচরণের দিকে তাকানো হয়, তখন সেই পুরনো ভীতি আর যন্ত্রণার এক ম্লান প্রতিফলন অস্পষ্টভাবে ভেসে ওঠে। রিমান্ডের নামে মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার সেই উল্লাস ছিল মূলত একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার নীল নকশা। ২০২৪ সালের “মনসুন রেভল্যুশন” পরবর্তী এই বিচারিক সংস্কার এবং ২০২৬-এর এই গ্রেপ্তার সেই কলঙ্কিত অধ্যায়ের দায়মুক্তির একটি সূচনা মাত্র।
ইতিহাসের আস্তাকুঁড় ও ন্যায়ের লড়াই
ক্ষমতার মায়া চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু মানুষের আর্তনাদের বিচার একদিন না একদিন হয়ই। বেইমানদের স্থান সবসময় ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। এই আইনি পদক্ষেপ কেবল একজনের বিচার নয়, বরং বাংলাদেশের লুণ্ঠিত সংবিধান আর একজন নিরুপায় মানুষের আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক মহত্তম লড়াই। ইতিহাসের পাতায় জেনারেল মাসুদরা কেবল বিশ্বাসঘাতক হিসেবেই টিকে থাকবেন, আর সেই হাসপাতালের বিকেলের অশ্রু হয়ে থাকবে ন্যায়ের পথে লড়াই করার অমর প্রেরণা।
