গ্যারেজ থেকে কৃষকের খেতে ‘অঙ্কুর’: কৃষি খাতে প্রযুক্তির বিপ্লব

ডিজিটাল কৃষি তথ্য ও পরামর্শ সেবাদাতা স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান অঙ্কুরের (বাম থেকে) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাশরুর এইচ সুহৃদ, প্রধান যোগাযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ইমতিয়াজ হোসেনছবি: অঙ্কুরের সৌজন্যে
ঢাকা
আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০: ৩৯
গাইবান্ধার এরেন্দাবাড়ী গ্রামের কৃষক শাহাদাত হোসেন। ৩৩ শতাংশ জমিতে চাষাবাদ করলেও চাষের মাটি তৈরি, আবহাওয়া ও ফসলের জাত নিয়ে তিনি সব সময় দ্বিধায় ভুগতেন। এর সঙ্গে ছিল চড়া সুদে নেওয়া ঋণের চাপ। এভাবেই চলছিল তাঁর কৃষকজীবন। ২০২৩ সালে স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) মাধ্যমে তাঁর পরিচয় হয় ডিজিটাল কৃষি তথ্য ও পরামর্শ সেবাদাতা স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ‘অঙ্কুর’-এর সঙ্গে। অঙ্কুরের নানা সেবা বদলে দেয় শাহাদাত হোসেনের জীবন এবং তার মতো হাজারো কৃষকের অনেক কাজকে সহজ করে তুলেছে।
অঙ্কুরের ডিজিটাল সেবা কীভাবে কাজ করে?
অঙ্কুর শাহাদাত হোসেনের জমির মাটি পরীক্ষা করে জানিয়ে দেয়, ‘বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১০’ জাতের ভুট্টা চাষই তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। সেই সঙ্গে বীজ, সার ও কীটনাশকের মোট খরচ এবং ব্যবহারের পরিমাণও জানিয়ে দেয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে আবহাওয়ার পূর্বাভাসও নিয়মিত পৌঁছে যায় কৃষকদের মুঠোফোনে। এমনকি ব্যাংক থেকে ৪ থেকে ৯ শতাংশ সুদে কৃষিঋণের সন্ধানও পাওয়া যায় তাদের প্ল্যাটফর্মে। (কৃষিখাতে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আপনার ওয়েবসাইটের একটি পুরোনো প্রতিবেদনের লিঙ্ক এখানে যুক্ত করুন)।
‘অঙ্কুর’ নয়, মূল নাম ‘আইপেজ গ্লোবাল’
দেশে কৃষকদের জন্য মাটি পরীক্ষার সেবা দেয় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই)। তবে তাদের ২৪টি গবেষণাকেন্দ্র থেকে ফল পেতে একজন কৃষকের ১৫ দিন বা তার বেশি সময় লেগে যায়। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে ২০১৯ সালে ‘আইপেজ গ্লোবাল’ নামে কয়েক বন্ধু মিলে শুরু করেন এই কৃষিসেবানির্ভর প্রতিষ্ঠান। এই নামেই উদ্যোগটি নিবন্ধিত হলেও ‘অঙ্কুর’ নামেই এটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। অঙ্কুরের দাবি, তাদের সেবা নেওয়ার পর কৃষকের ফসলের উৎপাদন গড়ে ১৫ শতাংশ এবং চাষের খরচ ২৫ থেকে ২৮ শতাংশ কমেছে। সব মিলিয়ে কৃষকের লাভের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ।
গ্যারেজ থেকে যাত্রা শুরু, এখন বিশাল কার্যালয়
রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডির একটি গ্যারেজের ১৮০ বর্গফুট জায়গা নিয়ে ২০১৯ সালে অঙ্কুরের যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাশরুর এইচ সুহৃদ। শুরুতে নিজেদের জমানো ২০ লাখ টাকা পুঁজি হিসেবে বিনিয়োগ করেন তাঁরা। পরে ইউনিলিভার বাংলাদেশের চেয়ারম্যান জাভেদ আখতারের মতো শুভাকাঙ্ক্ষীরা এগিয়ে আসেন, এবং সব মিলিয়ে প্রায় এক কোটি টাকা বিনিয়োগ পান। এখন প্রতিষ্ঠানটির মাসিক আয় ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা। পাঁচ জেলায় তাদের পাঁচটি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে।
কৃষকদের যেভাবে সেবা দেওয়া হয়
অঙ্কুরের ব্যবসায়িক ভিত্তি মূলত ডেটা সার্ভিস মডেল। একজন কৃষককে অঙ্কুরের সেবা নিতে প্রতি বিঘায় সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা খরচ দিতে হয়। তবে প্রথম দুই থেকে তিন মৌসুম বিনা খরচে তারা সেবা নিতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে জমির মাটি পরীক্ষা, আবহাওয়ার তথ্য, মৌসুমভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও ঋণের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা। বর্তমানে ঢাকা ব্যাংক ও শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক অঙ্কুরের তথ্য ব্যবহার করে কৃষকদের সহজে ঋণ দিচ্ছে।
অঙ্কুরের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ইমতিয়াজ হোসেন বলেন, “কৃষককে সঠিক সময়ে মাটি ও আবহাওয়ার তথ্য দিতে পারলে তাঁদের ফলন সহজেই বাড়ানো যায়। আমরা কৃষকদের মাটির উর্বরতা শক্তি ও সরকার-নির্ধারিত ক্রপ জোনিং বুঝে সঠিক জাতের নিবন্ধিত বীজ ও কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দিই।” ভবিষ্যতে খুলনা, সাতক্ষীরা ও কক্সবাজারে নিজেদের সেবার আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ফিলিপাইনে ছোট পরিসরে পাইলট প্রকল্প শুরুর পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।
