গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা: কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকার কাঠামোর আমূল সংস্কার প্রস্তাব

মোশাররফ হোসেন মুসা

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে যত আন্দোলন হয়েছে, তার মূলে রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের শাসনগত ত্রুটি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেবল কেন্দ্রীয় সরকার নয়, বরং স্থানীয় সরকারকেও একই সাথে সংস্কার করা অপরিহার্য। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করলেও, এদেশের ভূ-প্রকৃতি, জনঘনত্ব ও সংস্কৃতি বিবেচনায় একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ‘সিডিএলজি’ (সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক লোকাল গভর্ন্যান্স)-এর পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত এই রূপরেখাটি দেশের শাসনব্যবস্থাকে নীচ থেকে উপরমুখী (Bottom-up) পদ্ধতিতে পুনর্গঠনের একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা।

স্বাবলম্বী ও স্বশাসিত স্থানীয় সরকার: গণতন্ত্রের ভিত্তি

স্থানীয় মানুষের সেবা ও উন্নয়নের জন্য প্রতিটি প্রশাসনিক ইউনিটে যে স্বশাসিত ব্যবস্থা থাকে, তাকেই স্থানীয় সরকার বলে। আদর্শ নিয়ম অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নিজস্ব আয় দিয়ে প্রথমে দাপ্তরিক খরচ ও বেতন-ভাতা নির্বাহ করবে এবং উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে। ইউরোপীয় দেশগুলোতে স্থানীয় শাসন থেকেই জাতীয় শাসন বিকশিত হয়েছে। বাংলাদেশেও গ্রামীণ-নগরীয় বাস্তবতায় স্থানীয় সরকারকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা মানেই গোটা দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা।

সরকারের নামকরণ ও প্রকারভেদকরণ

বর্তমানে বাংলাদেশে কেবল ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ নামে একটিই সরকার বিদ্যমান। কিন্তু প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য সংবিধানে ‘স্থানীয় শাসন’-এর পরিবর্তে ‘স্থানীয় সরকার’ শব্দগুচ্ছ প্রতিস্থাপন করতে হবে। প্রতিটি স্থানীয় ইউনিটের সঙ্গে ‘সরকার’ শব্দটি যুক্ত করে (যেমন: ইউনিয়ন সরকার, উপজেলা সরকার, জেলা সরকার, নগর সরকার) সেগুলোকে প্রজাতান্ত্রিক রূপ দিতে হবে। এতে দেশে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয়—এই দুই প্রকার সরকারের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।

স্থানীয় ইউনিট অথবা স্থানীয় সরকারের প্রকারভেদকরণ

দেশের বিদ্যমান ইউনিটগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা প্রয়োজন:

  • গ্রামীণ স্থানীয় ইউনিট: ইউনিয়ন ও ১৬৪টি উপজেলা।
  • নগরীয় স্থানীয় ইউনিট: পৌরসভা ও নগর কর্পোরেশন।
  • গ্রামীণ-নগরীয় স্থানীয় ইউনিট: বিভাগ, জেলা ও গ্রামীণ-নগরীয় উপজেলা। বর্তমান ব্যবস্থায় সঠিক প্রকারভেদ না থাকায় ক্ষমতা ও দায়িত্বের সুষম বণ্টন সম্ভব হচ্ছে না।

প্রস্তাবিত একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ

তত্ত্বগতভাবে ‘জেলা’ হবে গ্রামীণ-নগরীয় চরিত্রের সর্বোচ্চ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। এর অধীনে একদিকে থাকবে গ্রামীণ ইউনিট (ইউনিয়ন ও উপজেলা সরকার) এবং অন্যদিকে থাকবে নগরীয় ইউনিট (পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন)। ২০৫০ সাল নাগাদ দেশ পূর্ণ নগরায়ণে রূপান্তরিত হলে স্থানীয় সরকার মূলত দুই স্তরবিশিষ্ট (জেলা ও নগর সরকার) কাঠামোতে চলে আসবে।

স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ন ইউনিট-ইউনিয়ন সরকার ও নগর সরকার

স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ন ইউনিট হতে হবে দুটি—ইউনিয়ন সরকার ও নগর সরকার। গ্রামীণ এলাকায় ইউনিয়নের নিচে আর কোনো প্রশাসনিক ইউনিটের প্রয়োজন নেই। ইউনিয়ন কার্যকর হওয়া মানেই গ্রাম ও ওয়ার্ড কার্যকর হওয়া। মধ্যবর্তী স্তর হিসেবে উপজেলার ওপর অতিমাত্রায় জোর দিতে গিয়ে ইউনিয়নকে দুর্বল করা হয়েছে, যা সংশোধন করা জরুরি।

বিভাগ অথবা প্রাদেশিক সরকার, না জেলা সরকার এবং জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ

বাংলাদেশের ভৌগোলিক আয়তনে ‘প্রদেশ’ সৃষ্টি ব্যয়বহুল ও অপ্রয়োজনীয়। বরং জেলাকে সর্বোচ্চ স্থানীয় ইউনিট হিসেবে শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটি জেলা থেকে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষের জন্য একজন নারী ও একজন পুরুষ প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন (মোট ১২৮ জন), যা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করবে।

স্থানীয় সরকারগুলোতেও ক্ষমতার পৃথকীকরণ তত্ত্বের প্রয়োগ

কেন্দ্রীয় সরকারের মতো স্থানীয় পর্যায়েও প্রশাসন, সংসদ ও আদালত সংবলিত ‘সরকার কাঠামো’ স্থাপন করতে হবে। স্থানীয় সংসদ ও স্থানীয় আদালত গঠিত হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘আমিই সরকার’—এই নাগরিক বোধ তৈরি হবে।

১০০-১০০ প্রতিনিধিত্বে নর-নারীর গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়ন

সরকারের সকল বিধানিক প্রতিষ্ঠানে নারী ও পুরুষের সমান (১০০-১০০) প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে ইউনিয়ন ও নগর সরকারের প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন নারী ও একজন পুরুষ সদস্য নির্বাচিত করার বিধান করতে হবে।

‘বটম-আপ’ পদ্ধতিতে ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রদান

ক্ষমতা নিচ থেকে উপরের দিকে বণ্টিত হতে হবে। ইউনিয়ন যা পারবে না তা উপজেলা, উপজেলা যা পারবে না তা জেলা সম্পাদন করবে। কেন্দ্রীয় সরকার কেবল জাতীয় ও বৈশ্বিক বিষয়গুলো তদারকি করবে। এতে স্থানীয় সরকারের পরনির্ভরশীলতা কাটবে।

স্থানীয় নির্বাচনী বোর্ড গঠন

প্রতিটি স্থানীয় ইউনিটে নিজস্ব ‘নির্বাচনী বোর্ড’ থাকবে। এতে কেন্দ্রীয় সরকারের বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে এবং স্থানীয় সরকারগুলো সময়মতো নিজস্ব অর্থে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম হবে।

স্থানীয় ন্যায়পালের পদ সৃষ্টি

নির্বাচিত প্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ইউনিটে একজন করে ‘ন্যায়পাল’ নিয়োগ করতে হবে।

৩৪২টি ‘নগর সরকার’ গঠন ও কৃষিজমি রক্ষা

ঢাকা শহরমুখী জনস্রোত কমাতে দেশের ৩৪২টি শহরে ‘নগর সরকার’ গঠন করতে হবে। এছাড়া ২ হাজার হাট-বাজার কেন্দ্রিক নতুন নগর সৃষ্টি করে কৃষিজমি রক্ষা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গ্রামীণ পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে।

স্থানীয় সরকারের সংখ্যা ও স্তর হ্রাস

সিস্টেম কস্ট কমাতে ৪,৫৭৮টি ইউনিয়নকে ৩,০০০-এ এবং উপজেলা সংখ্যা ৪০০-তে কমিয়ে আনা যেতে পারে। দক্ষ সরকার ব্যবস্থার জন্য স্তর বিন্যাস অপরিহার্য।

‘পার্বত্য জেলা সরকার’ বনাম পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে অসাংবিধানিক ‘আঞ্চলিক পরিষদ’-এর পরিবর্তে পার্বত্য জেলাগুলোতে ‘পার্বত্য জেলা সরকার’ গঠন করে বিদ্যমান সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

গোটা দেশের নগরায়ন, নগরীয় কৃষি ও নগর সরকার

২০৫০ সাল নাগাদ গোটা জনগোষ্ঠী নগরীয় সুবিধায় চলে আসবে। তাই ‘কৃষিকে নিয়েই নগর’—এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে স্কুল-কলেজে ‘নগরীয় কৃষি’ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

২০৫৫ সালের মধ্যে উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকে অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে না রেখে ২০২৬ সালের মধ্যে ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে (সংবিধান, সংসদ, আদালত, মিডিয়া ইত্যাদি) গণতন্ত্রায়ন সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।

শেষ কথা

উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণে স্বাবলম্বী ও স্বশাসিত স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই। স্থানীয় রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী হলে নাগরিকরা প্রকৃত অর্থে ক্ষমতায়িত হবে এবং জাতীয় রাজনীতির অস্থিরতা হ্রাস পাবে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *