ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বিরোধী বিক্ষোভ: সাধারণ শিক্ষার্থীর বেশে হলে ছাত্রদলের ইফতার

এস এম সাদিকুজ্জামান, বুটেক্স প্রতিনিধি

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) শহীদ আজিজ হলে ছাত্রদলের ব্যানারে ইফতার কর্মসূচি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের সামনে থেকে শুরু হয় এই বিক্ষোভ মিছিল। বিক্ষোভের প্রেক্ষিতে হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে নোটিশ জারি করা হলেও অবশেষে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বেশে দলীয় কোনো ব্যানার ছাড়াই ইফতার আয়োজন করে বুটেক্স ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

ইফতার কর্মসূচি নিয়ে উত্তপ্ত ক্যাম্পাস

১ম রমজান থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে বুটেক্স ছাত্রদল বিভিন্ন এলাকা ভিত্তিক সংগঠনের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ইফতার কর্মসূচি আয়োজন করে আসছে। পুরো রমজান মাস ব্যাপী তাদের এই ইফতার কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা আছে বলে জানা যায়। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল (২১ ফেব্রুয়ারি) বুটেক্স ছাত্রদল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আজিজ হলে দলীয় ব্যানারে ইফতার কর্মসূচী আয়োজনের ঘোষনা দেয়। রাজনীতি মুক্ত ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের এ কর্মসূচি ক্ষোভ সৃষ্টি করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে। ছাত্রদলের এই অনুষ্ঠানের প্রতিবাদ স্বরূপ সাধারণ শিক্ষার্থীরা ২২ ফেব্রুয়ারি শান্তিপূর্ণ মিছিল কর্মসূচির ডাক দেয়।

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও স্লোগান

কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের সামনে জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকে। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের সামনে থেকে আরম্ভ করে সম্পূর্ণ ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কক্ষের সামনে জড়ো হয়। এসময়ে স্লোগানে শিক্ষার্থীরা বলেন, “দালালি না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ”, “আপোষ না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম”, “ছাত্ররাজনীতির ঠিকানা এই বুটেক্সে হবেনা” প্রভৃতি।

উপাচার্য ও প্রশাসনের অবস্থান

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উপস্থিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. জুলহাস উদ্দিন বলেন, হলের পরিবেশ অরাজনৈতিক রাখতে আমি অত্যন্ত তৎপর এবং এই লক্ষ্যে আমি প্রোভোস্টের সাথে দীর্ঘ এক ঘণ্টা বৈঠক করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। উপাচার্য স্পষ্ট করে বলেন হলের ভেতরে কোনো ধরনের রাজনীতি করার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে তিনি সবাইকে উস্কানিতে কান না দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে থাকার এবং কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলায় না জড়িয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতার আহ্বান জানান।

প্রক্টরের কড়া হুঁশিয়ারি

বুটেক্সের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, ৫ আগস্টের পর থেকে শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থী উভয়েই লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে একমত এবং সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বর্তমানে ক্যাম্পাসে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অবৈধ। তিনি উল্লেখ করেন যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারো ব্যক্তিগত পোস্ট মানেই ছাত্ররাজনীতি চালু হওয়া নয় এবং অভিযুক্ত ৪৭, ৪৮ ও ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের বিষয়ে আসা অভিযোগগুলো প্রশাসন গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখবে। প্রক্টরিয়াল বডির সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তারা আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন এবং শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করেন যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্ররাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।

শিক্ষার্থীদের দাবি ও হল প্রশাসনের নোটিশ

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শোয়াইব আল জান্নাত বলেন, “আইনত ছাত্ররাজনীতি-মুক্ত এই ক্যাম্পাসে দলীয় ব্যানারে কোনো আয়োজন মেনে নেওয়া যায় না। শহীদ আজিজ হলে ইফতার কর্মসূচি ক্যাম্পাসে রাজনীতি ফিরিয়ে আনার অপচেষ্টা। আমরা প্রকাশ্য ও গোপন সব ধরনের ছাত্ররাজনীতির বিরোধী। প্রশাসনের কাছে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই এবং ৮ আগস্টকে ‘বুটেক্স ছাত্র রাজনীতি মুক্ত দিবস’ ঘোষণার আহ্বান জানাই।” পরবর্তীতে বেলা ৩টার দিকে শহীদ আজিজ হলের হল প্রভোস্ট কর্তৃক একটি নোটিশ প্রকাশ করা হয়। নোটিশে বলা হয়- শহীদ আজিজ হল প্রাঙ্গণ বা হল-সংলগ্ন এলাকায় কোনো রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ বা সংগঠনের ব্যানারে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, যেকোনো প্রকার অনুষ্ঠান, সভা, সমাবেশ, প্রচারণাসহ সকল প্রকার রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।

প্রশাসনের অনুমতি ও ইফতার আয়োজন

শহীদ আজিজ হলের হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীব জানিয়েছেন, হলের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বরদাস্ত করা হবে না। হলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে বহিরাগত বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রভাব রোধে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। শিক্ষক বা সাধারণ শিক্ষার্থী—কেউই হলের ভেতর রাজনীতি চান না। তবে বিকেলে ছাত্রদল সিনিয়ল নেতাদের হল প্রভোস্ট রুমে দেখা যায়। যেখানে তারা প্রভোস্ট টিমের থেকে সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে ইফতার করার অনুমতি নেয় এবং পরবর্তীতে হল প্রশাসন তাদের অনুমতিতে তারা দলীয় কোনো ব্যানার পোস্টার ছাড়াই ইফতার আয়োজন করে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *