
বরাবর,
সম্পাদক
দৈনিক জাহান
আপনার সাম্প্রতিক সম্পাদকীয়—“মিনিস্টার নন ফুয়াদ ভাই বাংলাদেশের মেগাস্টার”—লেখাটি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদের ওপর হামলার ঘটনায় আপনার ক্ষোভ, আবেগ এবং ‘ইস্পাতকঠিন’ অবস্থানকে সাধুবাদ জানাই। একজন সাংবাদিক হিসেবে আপনি যে ভাষায় বিচারহীনতার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, তা নিঃসন্দেহে সাহসিকতার পরিচয় দেয়। ‘মাইন্ড চার্জার’ বা ‘অদৃশ্য আঘাত’-এর মতো উপমাগুলো একজন নেতাকে সম্মান জানানোর জন্য যথার্থ হতে পারে।
কিন্তু শ্রদ্ধেয় সম্পাদক, একজন রাজপথের কর্মী এবং সচেতন ছাত্র হিসেবে আপনার এই লেখার দর্শন নিয়ে আমার একটি মৌলিক দ্বিমত ও প্রশ্ন রয়েছে।
আপনার পুরো লেখাটি আবর্তিত হয়েছে কেবল একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে। ব্যারিস্টার ফুয়াদ নিঃসন্দেহে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং তার ওপর হামলা নিন্দনীয়। কিন্তু দেশে কি কেবল তাঁর ওপরই হামলা হয়েছে? সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভিন্নমতের ওপর, সাধারণ ছাত্রদের ওপর এবং রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর এমন আরও অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা বা প্রশাসনের অসহযোগিতা কেবল ফুয়াদ ভাইয়ের ক্ষেত্রে নয়, বরং এটি এখন একটি সাধারণ চিত্র।
আমার পর্যবেক্ষণ হলো—আপনার লেখায় যখন শুধু একটি নির্দিষ্ট নাম বা ‘ফেস’ (Face) কে হাইলাইট করা হয়, তখন মূল সমস্যাটি ‘এককেন্দ্রিক’ (Uni-centric) হয়ে পড়ে। মনে হয়, সমস্যাটা বুঝি কেবল ওই ব্যক্তির সাথেই হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো, সমস্যাটা পুরো সিস্টেমের।
আপনি যদি আপনার ক্ষুরধার লেখনীতে কেবল ব্যারিস্টার ফুয়াদকে নায়ক না বানিয়ে, দেশের আনাচে-কানাচে ঘটে যাওয়া সমসাময়িক আরও ৫-১০টি হামলার ঘটনাকে এক সুতোয় গেঁথে তুলে ধরতেন, তবে লেখাটি কোনো ব্যক্তির গুণকীর্তন না হয়ে একটি ‘জাতীয় দলিল’ বা ‘জাতীয় ইস্যু’ হয়ে উঠত। তখন পাঠক বুঝত, রাষ্ট্র কেবল একজন ব্যারিস্টারকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে না, রাষ্ট্র আসলে তার নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
আমরা ছাত্ররা জুলাই বিপ্লবে রক্ত দিয়েছি সিস্টেম বদলানোর জন্য, নতুন কোনো ব্যক্তিকে ‘মেগাস্টার’ বা ‘আইকন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নয়। আমাদের লড়াইটা ব্যক্তির পূজা বা ব্যক্তির নিরাপত্তা নিয়ে নয়, আমাদের লড়াই সামষ্টিক ন্যায়বিচারের জন্য। যখন কোনো গণমাধ্যম কেবল ‘ভিআইপি’দের ওপর হামলাকে বড় করে দেখে এবং প্রান্তিক পর্যায়ের কর্মীদের ওপর হামলাকে সেই ক্যানভাসে জায়গা দেয় না, তখন অজান্তেই আমরা আবার সেই পুরনো ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক’ রাজনীতির ফাঁদে পা দেই।
‘দৈনিক জাহান’ এবং আপনার কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। আমরা চাই, আপনার কলম কেবল একজন ‘মেগাস্টার’-এর জন্য নয়, বরং এই জনপদের প্রতিটি আক্রান্ত মানুষের জন্য সমান তীব্রতায় গর্জে উঠুক। ব্যারিষ্টার ফুয়াদের ঘটনাটি একটি উদাহরণ হতে পারে, কিন্তু সেটাই একমাত্র ঘটনা নয়। বিষয়টিকে এককেন্দ্রিক না করে জাতীয় সংকটের আয়নায় দেখার আহ্বান রইল।
নিবেদক,
আলি হোসেন
সদস্য সচিব
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন (ময়মনসিংহ জেলা শাখা)

প্রিয় আলি হোসেন, আপনার এবং আমার গন্তব্য এক—ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন। আপনি চাইছেন ক্যানভাসের পুরো ছবিটা দেখতে, আর আমি চাইছি ছবির সবচেয়ে বড় ক্ষতটা দেখিয়ে চিকিৎসার শুরুটা নিশ্চিত করতে। ব্যারিস্টার ফুয়াদকে আমি ‘মেগাস্টার’ বলেছি তার জনপ্রিয়তার নিরিখে নয়, বরং এই দুঃসময়ে তিনি যে সাহসের বাতিঘর হয়ে জ্বলছেন—তার প্রতি সম্মান জানিয়ে।