ওয়ালিদ আহমেদ অলি

একসময় দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিরা ‘দেশপ্রেমিক‘ উপাধি পেতেন, তবে সম্প্রতি এর বৈপরীত্য দেখিয়েছেন শ্রেষ্ঠ পুলিশ উপপরিদর্শক (এসআই) জনাব আনোয়ার হোসেন। গত ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে, তিনি দুর্নীতি বিরোধী সাংবাদিকতা করার কারণে ‘দৈনিক জাহান’ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক শেখ মেহেদী হাসান নাদিমকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী‘ বলে আখ্যায়িত করেন, যা ম্যজিস্ট্রেসি ক্ষমতাপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ফয়সালের উপস্থিতিতেই ঘটে।
ফ্যাসিবাদ আছে সত্য দেখেও আমাদের এই নির্লজ্জ চুপ থাকায়। ফ্যাসিবাদ আছে আমাদের সুবিধাবাদী নীরবতায়। ফ্যাসিবাদ আছে আমাদের সবার মধ্যে, যারা ভাবি—”এটা আমার লড়াই নয়“। “আমার কী আসে যায়?” “চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা!” এই “আমার লড়াই নয়” নামক সুবিধাবাদের যে মহামারি, এই নীরবতার যে ফ্যাসিবাদ—তা আজ আমাদের সবাইকে, গোটা জাতিকে গ্রাস করেছে।
আমরা তো দেখিনি। শুনেছি। প্রবীণদের মুখে, ইতিহাসের পাতায়, সেই ১৯৭৪ সনের কথা শুনেছি ১৯৭৬ সনের কথা। শুনেছি এক চরম দুর্ভিক্ষের কথা। মরণান্তরের কথা। সে এক ভয়াল সময় ছিল। ভাতের আকাল। অন্নের জন্য হাহাকার। মানুষ তখন বাঁচার তাগিদে নাকি ঘাস খেয়েছে, লতাপাতা খেয়েছে। ডাস্টবিন থেকে কুকুরের খাদ্য কেড়ে নিয়ে খেয়েছে। কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন আছে। ইতিহাসবিদদের কাছে, সেই সময়কে পার করে আসা প্রবীণদের কাছে—মানুষ কি তখন ‘মানুষ’ খেয়েছে? একজনের পেটের ভাত কেড়ে, আরেকজন কি অট্টহাসি হেসেছে? সর্বস্বান্ত মানুষের শেষ সম্বলটুকুও কি রাষ্ট্র বা প্রতিবেশীরা কেড়ে নিয়েছিল? আমার তা মনে হয় না। পেটে ক্ষুধা ছিল, কিন্তু আত্মায় হয়তো তখনও কিছুটা সম্মানবোধ অবশিষ্ট ছিল। খুব জানতে ইচ্ছে করে।
আজ ২০২৫ সাল। আমি আমার জন্মভূমির চতুর্দিকে এক ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ দেখতে পাচ্ছি। না, না। ভুল ভাববেন না। এটা ভাতের দুর্ভিক্ষ নয়। গোডাউনে চাল উপচে পড়ছে, রেস্তোরাঁয় রাতভর পার্টি চলছে, উন্নয়নের ঝলকানিতে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। এই দুর্ভিক্ষ আরও গভীর, আরও সর্বনাশা। এটা চরিত্রের দুর্ভিক্ষ। এটা আত্মার মড়ক। এটা নৈতিকতার এক অতল গহ্বর। এই দুর্ভিক্ষে মানুষ ঘাস খায় না; এই দুর্ভিক্ষে মানুষ মানুষের বিবেক, সম্মান, স্বপ্ন আর আদর্শকে চিবিয়ে খায়।
এই মড়কের কোনো সচিত্র প্রতিবেদন দেখতে চান? কোনো প্রমাণ চান? আপনাকে বেশিদূর যেতে হবে না। আসুন, আমার সাথে আসুন। এই ময়মনসিংহে, এই বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে শেখ মেহেদী হাসান নাদিমের দিকে তাকান। এই জীবন্ত ট্র্যাজেডিবডিটির দিকে একবার তাকান। যিনি এই পচনশীল সমাজের, এই নৈতিক দুর্ভিক্ষের জলজ্যান্ত প্রমাণ, এই কদর্য সময়ের সবচেয়ে ব্যথিত সাক্ষী।
আমাকে, হ্যাঁ আমাকেই, আমাকে অভিযুক্ত করে যিনি বলেছিলেন, “অলি, তোমার কলমের কালি ফুরিয়ে যাচ্ছে!” হ্যাঁ। আমি স্বীকার করছি, ফুরিয়ে যাচ্ছিল। আমার হাত কাঁপছিল। কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম না, ফ্যাসিবাদ শুধু অত্যাচারের মধ্যেই; ফ্যাসিবাদ শুধু বন্দুকের নলে, গুমের গাড়িতে বা কারাগারের অন্ধকারে?
এই ভয়াবহ নৈতিক দুর্ভিক্ষের প্রথম শিকার কারা জানেন? তথাকথিত “বিপ্লবীরা“। নতুন দিনের স্বপ্ন দেখানো তরুণেরা। আমারই সাথের “বন্ধু”, জুলাই আন্দোলনের “সহযোদ্ধা“, যাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্লোগান দিয়েছি, তারা কিছুদিন আগে নাদিম ভাইয়ের সঙ্গ ত্যাগ করলো। এই মানুষটি, এই আলোকবর্তিকা, যিনি নিজের জীবন দিয়ে আমাদের পথ দেখাচ্ছেন, তারা তার আলোয় এক মুহূর্ত দাঁড়াতে পারলো না। কেন? কারণ এই আলো তাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল? না। কারণ এই আলো তাদের পকেট ভরাতে পারছিল না। তারা চলে যাওয়ার আগে নির্লজ্জের মতো বলে গেল, “নাদিম ভাইয়ের কাছে এসেছিলাম অনেক টাকা-পয়সা ইনকাম করতে পারবো এরকমটা ভেবে। ভেবেছিলাম ওনার নাম ভাঙিয়ে, ওনার সাথে থেকে কিছু ধান্দা করা যাবে। অথচ উনার সাথে থেকে শুধু জ্ঞানী বাণী আর সৎ পরামর্শ পাচ্ছি। শুধু আদর্শের কথা, দেশের কথা! সঠিক পথের নির্দেশনা ছাড়া তার হাত দিয়ে কোন টাকা-পয়সা ইনকাম করতে পারছি না! এভাবে আর কতদিন?”
টাকা! টাকা! টাকা! বিপ্লবের দামও আজ টাকা! যে বিপ্লব হয়েছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে, সেই বিপ্লবের নাম ভাঙিয়েই তারা দুর্নীতির খোঁজে নেমেছে! তারা আদর্শের উত্তাপ নিতে আসেনি, তারা এসেছিল আগুন পোহাতে। তারা ভেবেছিল, এই আগুন হয়তো তাদের শীতের আরাম দেবে, তাদের পকেট গরম করতে পারবে। যখন দেখলো এই আগুন শুধু আলো ছড়ায়, পথ দেখায়, কিন্তু কোনো কাঁচা টাকার জন্ম দেয় না, তারা লেজ গুটিয়ে চলে গেল। এটাই চরিত্রের দুর্ভিক্ষ। এটাই আত্মার মড়ক।
এই দুর্ভিক্ষের দ্বিতীয় শিকার কারা? “সাংবাদিকেরা“। কলমজীবী। জাতির তথাকথিত বিবেক। সমাজের দর্পণ। গত সপ্তাহে কিছু নামধারী “সাংবাদিক” এলেন। ঢাকা থেকে এলেন। এই নির্যাতিত, সর্বস্বান্ত, নিঃসঙ্গ মানুষটাকে “দেখতে” এলেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে এবং এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে এলেন! এসে কী করলেন? তারা এসে সেই নাদিম ভাইয়ের কাছেই—যার পত্রিকা এই রাষ্ট্রযন্ত্র বন্ধ করে দিয়েছে, যার বাড়ি এই রাষ্ট্রযন্ত্র লুট করেছে, যার সর্বস্ব তারা কেড়ে নিয়েছে, যিনি আজ একপ্রকার কপর্দকশূন্য—তার কাছেই, হ্যাঁ, তার কাছেই এসে বললেন, এই শহরে থাকার, খাওয়ার এমনকি ঢাকায় ফিরে যাওয়ার খরচটিও তাদের কাছে নেই…!
আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমি শুনেছি, শকুনও তো লাশের মাংস খায়। কিন্তু জীবন্ত মানুষের নয়! এই কলমজীবী শকুনেরা, এই নৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া প্রেতাত্মারা, একজন জীবন্ত, লড়াকু মানুষের রক্তমাংস খেতেও দ্বিধা করলো না। এই দুর্ভিক্ষের গভীরতা কতটুকু, এর অতল গহ্বর ঠিক কতটা অন্ধকার, তা মাপার কোনো যন্ত্র আমার জানা নেই।
এবং এই নৈতিক দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে পৈশাচিক, সবচেয়ে কদর্য, সবচেয়ে নির্লজ্জ রূপটা দেখিয়েছে খোদ রাষ্ট্র। আমাদের “মহান” রাষ্ট্রযন্ত্র। তারা শেখ মেহেদী হাসান নাদিমকে থামাতে চেয়েছিল। যেভাবেই হোক। কেন? কারণ তিনি অপরাধ করেছিলেন। ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। তার প্রথম অপরাধ, তিনি লিখেছিলেন তিনি রাষ্ট্রকে, রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রকে “পরজীবী” (parasites) এবং “শকুন” (vultures) বলে অভিযুক্ত করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষার কথা, এই দেশের উদ্যোক্তারাই দেশের আসল “ইঞ্জিন“, আর রাষ্ট্র নামক এই পরজীবীরা সেই ইঞ্জিনকে কুরে কুরে খাচ্ছে। তিনি আরও বড় অপরাধ করেছিলেন। তিনি ১৯৭৩ সালের সেই “ঘৃণ্য” মুদ্রণ ও প্রকাশনা আইনের বিরুদ্ধে, যে আইন দিয়ে গণমাধ্যমের গলায় শেকল পরানো হয়, সেই কালা কানুনের বিরুদ্ধে সরাসরি হাইকোর্টে রিট পিটিশন করেছিলেন। তিনি আমলাতন্ত্রের হাতে, ডিসি-এসপির হাতে গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরার এই রাষ্ট্রীয় আয়োজনকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। সত্যি। এরচেয়ে বড় অপরাধ আর কী হতে পারে? ইতিহাস সাক্ষী, যখনই কেউ সত্য বলেছে, যখনই কেউ সিস্টেমের পচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, সিস্টেম তার হাতে বিষের পেয়ালা এগিয়ে দিয়েছে। সক্রেটিসকে হেমলক দেওয়া হয়েছিল, কারণ তিনি “সত্য” বলে তরুণদের “মন” নষ্ট করছিলেন। গ্যালিলিওকে দণ্ড দেওয়া হয়েছিল, কারণ তিনি বলেছিলেন পৃথিবীটা ঘোরে, যা সিস্টেমের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গিয়েছিল। ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। নাদিম ভাইয়ের অপরাধ, তিনি বলেছেন—সিস্টেমটা পচে গেছে। আর তাই, এই আধুনিক ইনকুইজিশন, এই রাষ্ট্রযন্ত্র, তাকে একযোগে দণ্ড দিচ্ছে।

তারা প্রথমে তার কলম কেড়ে নিলো। তারা ভাবলো, কলম কেড়ে নিলেই বুঝি লেখা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তারা তার বাবার, মরহুম হাবিবুর রহমান শেখের, অর্ধশত বছরের প্রাচীন ‘দৈনিক জাহান’ পত্রিকাটির লাইসেন্স এক কলমের খোঁচায় বাতিল করে দিলো। যে পত্রিকা থেকে এই ময়মনসিংহ অঞ্চলের ৯৫ ভাগ সাংবাদিকের জন্ম! যে পত্রিকাটির জন্ম বাংলাদেশের জন্মের আগে! সেই ইতিহাস, সেই ঐতিহ্যকে তারা মুহূর্তেই ধ্বংস করে দিল। তারা তার ঘর কেড়ে নিতে চাইলো। তারা ভাবলো, ঘর কেড়ে নিলেই বুঝি মানুষ থেমে যায়। তার আদর্শ মুখ থুবড়ে পড়ে। তাই তারা সেই অভিশপ্ত ২৪শে ডিসেম্বরের কালরাতে তার বাড়িতে তাণ্ডব চালিয়েছে। মিথ্যা অভিযোগে, বিনা ওয়ারেন্টে, আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা হামলা করেছে। সাত-সাতটি ভারী, মিথ্যা মামলা দিয়েছে। তাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। তারা তার সম্পদ কেড়ে নিতে চাইলো। তারা ভাবলো, সম্পদ কেড়ে নিলেই বুঝি আদর্শ মরে যায়। মানুষ অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে গেলে আর লড়তে পারে না। তাই তারা লুট করেছে। ভুল বললাম। এটা সাধারণ লুট নয়। এটা রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে লুট! আমি আবার বলছি, রাষ্ট্রীয় লুট! তারা সেই রাতে, সেই বাড়ি থেকে ২২ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করেছে। দশ লক্ষাধিক টাকা লুট করেছে। তিনটি বাড়ি আর ‘দৈনিক জাহান’ পত্রিকা অফিস থেকে অর্ধ কোটি টাকার ক্যামেরা, দামী দামী ল্যাপটপ, কম্পিউটার, পত্রিকার ভারী ভারী মেশিনারি—সব, সব লুট করেছে। তারা ভাবলো, এভাবে সব কেড়ে নিলেই বুঝি আলোকবর্তিকা নিভে যাবে। কিন্তু… কিন্তু এই দুর্ভিক্ষের আসল চেহারাটা এবার দেখুন। এই নৈতিক মড়কের গভীরতাটা উপলব্ধি করুন। এই রাষ্ট্রের ক্ষুধা এত তীব্র, এই মড়ক এত গভীর, এই ব্যবস্থার চরিত্র এত দেউলিয়া যে— এই হতদরিদ্র পুলিশগুলো, এই রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যরা, সেই বাড়ির রান্নাঘরে ঢুকেছে! তারা… তারা সেই মানুষটার ঘরের চাল চুরি করে নিয়ে গেছে! হ্যাঁ, চাল! যা দিয়ে মানুষ ভাত খায়। বড় বড় প্লাস্টিকের বোতলে ভরে তারা সেই চাল নিয়ে গেছে! তারা ঘরের লাইট, ফ্যান লুট করার পাশাপাশি… ৮০ টাকা দামের একটা ছোট চার্জ লাইটও চুরি করেছে!
আমার মাথা কাজ করে না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। আমি যখনই ভাবি, ৩২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে যে রাষ্ট্র পদ্মা সেতু বানায়, সেই রাষ্ট্রের পুলিশকে, সেই রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলার বাহিনীকে, একজন সত্যবাদী সাংবাদিককে থামাতে হলে, তাকে শায়েস্তা করতে হলে, তার ঘরের চাল আর ৮০ টাকার চার্জ লাইটও চুরি করতে হয়! ছিঃ! এরচেয়ে বড় দেউলিয়াপনা আর কী হতে পারে? এরচেয়ে বড় ফ্যাসিবাদ আর কী হতে পারে? এরচেয়ে বড় দুর্ভিক্ষ আর কাকে বলে? আর এই সেই সেতু! কী নির্মম, পৈশাচিক পরিহাস! এই ৩২০০ কোটির সেতুর প্রজেক্ট ম্যানেজার (পিএম) দিদারুল আলম, তিনি আবার নাদিম ভাইয়ের আত্মীয়। একদিন এই পিএম সাহেবকেই প্রকল্পের বাধা সরাতে, কিছু ভুঁইফোঁড় “কীটপতঙ্গ” পরিষ্কার করতে, এই নাদিম ভাইয়েরই সাহায্য নিতে হয়েছিল। সেদিন নাদিম ভাই রাষ্ট্রকে সাহায্য করেছিলেন, এই মেগা প্রজেক্টকে সচল রাখতে সাহায্য করেছিলেন। আর আজ? আজ সেই সেতুর জন্য সবার জমি অধিগ্রহণ হলো। সবাই টাকা পেলো। শুধু এই “রাষ্ট্রদ্রোহী” নাদিম ভাইয়ের জমিটিও অধিগ্রহণ করা হলো, কিন্তু তাকে তার ন্যায্য প্রাপ্য ১৬ লাখ টাকার একটা পয়সাও দেওয়া হলো না! উল্টো, তার নিজের জমিতে তারই যাতায়াত বন্ধ! সেখানে প্রকল্পের ভারী ভারী বস্তু রাখা। না জুটলো ভাড়া, না জুটলো জমির মূল্য! এটাই তার পুরস্কার। এটাই তার দেশপ্রেমের দাম। রাষ্ট্র তাকে এভাবেই কৃতজ্ঞতা জানালো! ফরাসি লেখক এমিল জোলা একদিন “J’Accuse…!” (“আমি অভিযোগ করছি…!”) শিরোনামে একটি খোলা চিঠি লিখেছিলেন। তিনি রাষ্ট্রকে, সেনাপ্রধানকে, আদালতকে—সবাইকে একজন নিরপরাধ মানুষকে (আলফ্রেড দ্রেফুস) মিথ্যা অভিযোগে দণ্ডিত করার জন্য অভিযুক্ত করেছিলেন। সেই এক চিঠি গোটা ফ্রান্সকে, গোটা ইউরোপকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। আজ আমি, ওয়ালিদ আহমেদ অলি, ময়মনসিংহের মাটি থেকে দাঁড়িয়ে, এই নৈতিক দুর্ভিক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, এই পচনশীল সিস্টেমের একজন ব্যথিত সাক্ষী হয়ে, আমিও অভিযোগ করছি!
আমি অভিযোগ করছি সেই “বিপ্লবী” বন্ধুদের বিরুদ্ধে, যারা আদর্শের চেয়ে টাকাকে বড় ভেবেছে এবং বিপ্লবের সাথে বেঈমানি করেছে! আমি অভিযোগ করছি সেই “সাংবাদিক” শকুনদের বিরুদ্ধে, যারা জাতির বিবেক সেজে জীবন্ত মানুষের মাংস খেতে দ্বিধা করে না! আমি অভিযোগ করছি সেই “হতদরিদ্র” পুলিশি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যাদের আত্মা এতটাই দরিদ্র যে একজন নিঃস্ব মানুষের ঘরের চাল আর ৮০ টাকার চার্জ লাইটও ছাড় দেয় না! আমি অভিযোগ করছি সেই “কৃতজ্ঞ” রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে, যে ব্যক্তি তার ৩২০০ কোটির প্রকল্প বাঁচায়, রাষ্ট্র তার ১৬ লাখ টাকা মেরে দেয় এবং তাকেই উল্টো ভূমিদস্যু বানানোর চেষ্টা করে! আমি অভিযোগ করছি এই গোটা সিস্টেমের বিরুদ্ধে, যা তার নিজের ‘শ্বেত রক্তকণিকা‘কে (White Blood Cell) ধ্বংস করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে! কেন? কারণ ফ্যাসিস্টদের প্রথম কাজই হলো, শরীরের সমস্ত শ্বেত রক্তকণিকাকে, সমস্ত প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ধ্বংস করে ফেলা। তারপর আরামে বসে, বিনা বাধায়, দেশের বারোটা বাজানো। আমরা কিসের দেশপ্রেমিক হলাম? কেন আমাদের হাতে ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমরা আজ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারছি না? সারা দেশ, সারা শহর, সবাই জানে, সবাই দেখেছে এই লোকটা কতটা নির্যাতিত, কতটা বঞ্চিত, কতটা একা। তবুও সব চুপ। সব নীরব। এই নীরবতাই আজকের দুর্ভিক্ষ। এই নীরবতাই আজকের সবচেয়ে বড় ফ্যাসিবাদ। কিন্তু শুনে রাখুন। আমার কালি ফুরিয়ে যায়নি। আমার কলম থামেনি। আমার কার্পণ্য শেষ। যন্ত্র হয়তো কেড়ে নেওয়া যায়, পত্রিকা হয়তো বন্ধ করা যায়, কিন্তু সত্যের পক্ষে যে আরজি, তা কখনো থামে না। তারা চাল চুরি করেছে, আত্মা নয়। তারা চার্জ লাইট চুরি করেছে, ভেতরের আগুন নয়। এই আগুন নেভানোর ক্ষমতা কোনো ফ্যাসিস্টের নেই। কোনো স্বৈরাচারের নেই। নাদিম ভাই সেই আলোকবর্তিকা। তিনি জ্বলছেন। এবং জ্বলবেন। আমার একটাই প্রশ্ন, গোটা জাতির কাছে, এই রাষ্ট্রের কাছে— আমরা কি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত একজন লড়াকু, সত্যবাদী মানুষকে তার উপযুক্ত পুরস্কার, তার সম্মানটুকু দিতে পারবো না? নাকি আমরা শুধু লাশের মিছিলে ফুল দিতেই শিখেছি? আমরা কি শুধু আরেকটা সক্রেটিস, আরেকটা ব্রুনোর মৃত্যুর জন্যই অপেক্ষা করছি?
