আগে আসনের প্যাথলজিক্যাল রিপোর্ট করুন, তারপর এমপি হওয়ার স্বপ্ন দেখুন!

শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

ফেব্রুয়ারির ১২, ২০২৬। ক্যালেন্ডারের পাতায় এটি কেবল একটি তারিখ নয়; এটি চব্বিশের জুলাইয়ে রাজপথে ঝরে পড়া রক্তের সাথে বিশ্বাসভঙ্গের বা প্রতিশ্রুতি রক্ষার এক চূড়ান্ত বোঝাপড়ার দিন। দীর্ঘ দেড় দশকের জঞ্জাল সরিয়ে আমরা যখন ‘রাষ্ট্র মেরামতের’ স্বপ্ন দেখছি, তখন সনাতন রাজনীতির মঞ্চে এক নতুন কুশীলবের আবির্ভাব হয়েছে—তার নাম ‘ডেটা’ বা উপাত্ত।

নির্বাচনী মাঠে এবার আর শুধু আবেগের স্লোগান বা গলার জোরের স্থান নেই। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের সামনে একটি কঠিন সত্য দাঁড় করিয়েছে: জনগণের পালস না বুঝে, মাটির কাছাকাছি না গিয়ে, এবং বৈজ্ঞানিক ‘ফিল্ড স্টাডি’ ছাড়া প্রার্থী হওয়ার দুঃসাহস দেখানো হবে আত্মঘাতী।

একসময় রাজনীতি ছিল অনুমানের খেলা। ড্রয়িংরুমে বসে ‘ভাইয়ের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী’—এই ধুয়া তুলে নমিনেশন বাগিয়ে নেওয়ার দিন ফুরিয়েছে। আজকের ভোটার, বিশেষ করে ‘জেন-জি’ (Gen-Z), তথ্যে বিশ্বাসী, তোষামোদে নয়। তারা প্রশ্ন করতে শিখেছে।

আমার প্রস্তাবনাটি খুব স্পষ্ট এবং কিছুটা নিষ্ঠুর—যারা নির্বাচনে দাঁড়াতে চান, তাদের আগে নিজেদের নির্বাচনী এলাকায় একটি নির্মোহ ‘ফিল্ড স্টাডি’ বা মাঠ জরিপ করাতে হবে। এটি কোনো লোকদেখানো জনসভা নয়, বরং একটি বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা। আপনার এলাকার কত শতাংশ তরুণ বেকার?  কতজন নারী নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত? দ্রব্যমূল্যের কশাঘাতে পিষ্ট মধ্যবিত্তের ঠিক কোন সমাধানটি আশু প্রয়োজন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি আপনার টেবিলে থাকা ফাইলে না থাকে, তবে আপনি জননেতা নন, আপনি একজন জুয়াড়ি মাত্র।

ধরা যাক, একজন প্রার্থী তার ফিল্ড স্টাডি রিপোর্টে দেখলেন যে, তার এলাকার ৭০ শতাংশ তরুণ ভোটার ‘স্মার্ট কর্মসংস্থান’ চায়, কিন্তু প্রার্থীর ইশতেহারে আছে কেবল ‘রাস্তা-ঘাট উন্নয়নের’ গৎবাঁধা প্রতিশ্রুতি। এই রিপোর্ট তখন প্রার্থীর মুখের সামনে একটি আয়না। এই আয়না বলে দেবে—আপনার সক্ষমতা এবং জনআকাঙ্ক্ষার মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব।

যদি রিপোর্ট বলে যে, জনগণ আপনাকে প্রত্যাখ্যান করছে বা আপনার দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নযোগ্য নয়—তবে কি আপনি সরে দাঁড়ানোর সৎসাহস দেখাতে পারবেন? রাজনীতির এই নতুন ব্যাকরণ বলছে—“যদি প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারেন, তবে দয়া করে আসবেন না।” এটিই আধুনিকতা। জোর করে চাপিয়ে দেওয়া নেতৃত্ব আর চলবে না।

জুলাই বিপ্লবের পর গত প্রায় দেড় বছরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার এবং নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান ভোটারদের মনস্তত্ত্বে আমূল পরিবর্তন এনেছে। সানেম (SANEM) বা ব্র্যাক ইন্সটিটিউটের (BIGD) মতো সংস্থাগুলোর জরিপ বলছে, মানুষ এখন আর কেবল ‘ভোট’ দিতে চায় না, তারা চায় ‘ফলাফল’।

প্রার্থীদের মনে রাখতে হবে, এবারের নির্বাচন শুধু এমপি হওয়ার নির্বাচন নয়; এটি ‘জুলাই চার্টার’ বা সনদের ওপর গণভোটের শামিল। ভোটারদের হাতে এবার দুটি অস্ত্র—একটি ব্যালট, অন্যটি তাদের স্মৃতি। তারা ভুলেনি চব্বিশের উত্তাল দিনগুলো। তাই যে প্রার্থী ফিল্ড স্টাডি করে দেখবেন যে তিনি জুলাইয়ের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক বা তার অতীত কর্মকাণ্ডের কারণে জনবিচ্ছিন্ন, তার জন্য এই নির্বাচন হবে একটি ট্র্যাজেডি।

ভোটারদের উচিত প্রার্থীদের জিজ্ঞেস করা, “আপনার হোমওয়ার্ক কোথায়?”। আপনি যে বলছেন ১ কোটি চাকরি দেবেন, তার রোডম্যাপ কি কোনো অর্থনীতিবিদ বা ডেটা সায়েন্টিস্ট দ্বারা পরীক্ষিত? নাকি এটি শুধুই নির্বাচনী বুলি? ।

এই লেখাটি ভোটাররা সংগ্রহে রাখুন। যখনই কোনো প্রার্থী আপনার দ্বারে আসবেন, মিলিয়ে দেখবেন—তিনি কি আপনার মনের ভাষা পড়েছেন, নাকি মুখস্থ বুলি আউড়ে যাচ্ছেন। যে প্রার্থী আপনার সমস্যার ‘ডাটা’ জানে না, সে আপনার সমস্যার সমাধানও জানে না।

ভাষার যেমন ব্যাকরণ থাকে, রাজনীতিরও থাকা উচিত। ২০২৬ সালের নির্বাচনের ব্যাকরণ হলো—সত্যকে মেনে নেওয়া। প্রার্থীদের প্রতি আহ্বান, আগে নিজেকে যাচাই করুন, পরে জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিন। ফিল্ড স্টাডি রিপোর্ট যদি বলে ‘আপনি যোগ্য’, তবেই মাঠে নামুন। আর যদি বলে ‘না’—তবে সরে দাঁড়িয়ে দেশপ্রেমের পরিচয় দিন।

কারণ, ভুল ব্যাকরণে লেখা কবিতা যেমন সাহিত্য হয় না, তেমনি ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে করা রাজনীতি আর যা-ই হোক, ‘গণতন্ত্র’ হতে পারে না।

About The Author

2 thoughts on “আগে আসনের প্যাথলজিক্যাল রিপোর্ট করুন, তারপর এমপি হওয়ার স্বপ্ন দেখুন!

  1. সময় উপযোগী লেখা, এ যেন ভোটারের মনের কথা আপনার কলমের মাধ্যমে প্রকাশ পেল।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *