অস্থায়ী সরকার প্রণীত ১৩৩ অধ্যাদেশের রক্ষায় ‘যৌক্তিক কালক্ষেপণের’ ৫টি পরামর্শ

শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

প্রতিকী ছবি।

জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের আইনি বৈধতা যাচাইয়ের কাজ শুরু করেছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া, কারণ এই অধ্যাদেশগুলোর ওপর ভিত্তি করেই আগামী দিনের রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারিত হবে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাত্র ১৪ সদস্যের একটি কমিটির পক্ষে দুই সপ্তাহের সংক্ষিপ্ত সময়ে এত বিপুল সংখ্যক জটিল ও সংবেদনশীল অধ্যাদেশের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা প্রায় অসম্ভব।

দ্রুত আইন প্রণয়নের ঝুঁকি ও জনস্বার্থ

বিগত দিনের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং আইন প্রণয়নের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পর্যাপ্ত বিতর্ক ও সরাসরি জনমত গ্রহণ ছাড়া দ্রুত পাস করা আইনগুলো শেষ পর্যন্ত জনস্বার্থের বিপরীতে গিয়ে দাঁড়ায়। আইনের একটি ক্ষুদ্র শব্দের মারপ্যাঁচেও নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই তড়িঘড়ি করে এই ১৩৩টি অধ্যাদেশকে স্থায়ী রূপ না দিয়ে, সেগুলোর গুণগত মান ও জনআকাঙ্ক্ষা রক্ষায় নিচের ৫টি ‘যৌক্তিক কালক্ষেপণ’ ও পর্যালোচনার পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে:

১. বিষয়ভিত্তিক সাব-কমিটি গঠন: ১৪ জনের মূল কমিটির পক্ষে ১৩৩টি অধ্যাদেশ পড়া বা বিশ্লেষণ করা বাস্তবিক নয়। এক্ষেত্রে অর্থ, আইন ও প্রশাসন—এই তিনটি প্রধান খাতে ভাগ করে ৩টি পৃথক সাব-কমিটি গঠন করা যেতে পারে। প্রতিটি সাব-কমিটি নির্দিষ্ট সংখ্যক অধ্যাদেশ নিয়ে কাজ করলে আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে একটি নিরেট রিপোর্ট দেওয়া সম্ভব হবে।

২. জনমত ও বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ: অধ্যাদেশগুলো যেহেতু সরাসরি জনস্বার্থের সাথে যুক্ত, তাই সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের (যেমন: ব্যাংকিং খাতের জন্য অর্থনীতিবিদ বা প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য জ্যেষ্ঠ আমলা) মতামত নেওয়ার জন্য অন্তত ১০ দিনের একটি উন্মুক্ত সময় দেওয়া আবশ্যক। আধুনিক ডিজিটাল যুগে ইমেইল বা অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে এই মতামত সংগ্রহ করা অত্যন্ত সহজ, যা আইনের স্বচ্ছতা ও জনগ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

৩. ‘সানসেট ক্লজ’ বা অন্তর্বর্তীকালীন অনুমোদনের বিধান: যদি সাংবিধানিক সময়সীমার কারণে দ্রুত পাস করার বাধ্যবাধকতা থাকে, তবে জটিল অধ্যাদেশগুলোর ক্ষেত্রে একটি ‘সানসেট ক্লজ’ যুক্ত করা যেতে পারে। এর অর্থ হলো, এগুলো আপাতত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কার্যকর হবে এবং এই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটি বিস্তারিত যাচাই-বাছাই ও জনমত গ্রহণ করে চূড়ান্ত বিল আকারে পেশ করবে। এতে আইনি শূন্যতাও তৈরি হবে না, আবার তাড়াহুড়োর ভুলও এড়ানো যাবে।

৪. প্রতিটি অধ্যাদেশের ওপর পৃথক বিতর্ক: কমিটির রিপোর্ট আসার পর সব অধ্যাদেশ একযোগে পাস না করে, গুরুত্বপূর্ণ অন্তত ১০-১৫টি অধ্যাদেশের ওপর সংসদে পৃথক সাধারণ আলোচনার সুযোগ দিতে হবে। এতে সংসদের বাকি ৩০০-এর অধিক সদস্যের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে এবং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে।

৫. ডিজিটাল ফিডব্যাক ও সরাসরি নাগরিক সম্পৃক্ততা: সংসদীয় সচিবালয় একটি অস্থায়ী ওয়েব পোর্টাল চালু করতে পারে যেখানে প্রতিটি অধ্যাদেশের খসড়া সর্বসাধারণের দেখার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। নাগরিকরা সেখানে নির্দিষ্ট ধারার ওপর সরাসরি আপত্তি বা সংশোধনী প্রস্তাব দিতে পারবেন। এটি একটি ‘স্মার্ট পার্লামেন্ট’ এবং স্বচ্ছ আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার উজ্জ্বল উদাহরণ হতে পারে।

পরিশেষে, আইন প্রণয়ন কোনো প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; এটি একটি পবিত্র আমানত। বিশেষ কমিটি যদি কেবল সংখ্যাধিক্যের জোরে বা আইনি বাধ্যবাধকতার দোহাই দিয়ে দ্রুত রিপোর্ট জমা দেয়, তবে তাতে ত্রুটি থেকে যাওয়ার ঝুঁকি প্রবল। আইনের গুণগত মান নিশ্চিত করতে এবং জনমতের প্রতিফলন ঘটাতে যদি আরও কিছুদিন সময় ব্যয় হয়, তবে সেই ‘যৌক্তিক কালক্ষেপণ’ হবে একটি সুদূরপ্রসারী ও টেকসই প্রশাসনিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *