অবিনশ্বর জীবনের জয়গান: একটি সাদা অ্যাপ্রনের আর্তনাদ ও ফিরে আসার গল্প

শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

রাত তখন গভীর। চারপাশের পৃথিবী যখন ঘুমের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত, ঠিক তখন কোনো এক নির্জন কক্ষের কোণে একটি নিভু নিভু আলো জ্বলছে। টেবিলের ওপর পাহাড়সম বইয়ের স্তূপ—অ্যানাটমি, ফিজিওলজি আর প্যাথলজির নিষ্ঠুর অক্ষরগুলো যেন জীবন্ত হয়ে শিক্ষার্থীর টুঁটি চেপে ধরতে চাইছে। সাদা অ্যাপ্রনটা পাশের চেয়ারে অবহেলায় ঝুলে আছে—ঠিক যেন একজোড়া অদৃশ্য ডানা, যা উড়তে ভুলে গেছে। যে হাতগুলো দিয়ে আগামীর কোনো এক ভোরে কোনো এক মুমূর্ষু শিশুর নাড়ি পরীক্ষা করার কথা ছিল, সেই হাতগুলোই আজ কাঁপছে—এক মুঠো ঘুমের ওষুধ আর এক টুকরো বিষণ্ণতার মোহে।

এটি কোনো নির্দিষ্ট শহরের গল্প নয়, এটি কোনো গণ্ডিবদ্ধ ভূখণ্ডের চিত্র নয়। এটি হলো সেই শ্বেতশুভ্র জগতের এক নিদারুণ গোপন সত্য, যেখানে জীবন বাঁচাতে শেখানো হয়—কিন্তু নিজের জীবনকে ভালোবাসতে শেখানোটা যেন সিলেবাসের বাইরে রয়ে যায়।

শ্বেতশুভ্র অ্যাপ্রনের নিচে লুকানো এক কৃষ্ণগহ্বর

চিকিৎসাবিজ্ঞানের জগৎটি বাইরে থেকে যতটা মহৎ আর গ্ল্যামারাস মনে হয়, এর অভ্যন্তরটি ততটাই পিচ্ছিল আর অন্ধকার। একজন শিক্ষার্থী যখন এই পথে পা বাড়ায়, সে শুধু একটি ডিগ্রি অর্জন করতে আসে না; সে আসে মানুষের দুঃখ মোচনের শপথ নিতে। কিন্তু এই শপথের পথটি কণ্টকাকীর্ণ।

  • ক) যান্ত্রিকতার চাপে পিষ্ট মানবতা: দিনের পর দিন মৃতদেহের ব্যবচ্ছেদ করা, মানুষের পচা ঘা আর আর্তনাদ দেখা যখন প্রাত্যহিক রুটিন হয়ে যায়, তখন মনটা অজান্তেই যান্ত্রিক হয়ে পড়ে। কিন্তু এই যান্ত্রিকতার আবরণে ঢাকা পড়ে যায় শিক্ষার্থীর নিজস্ব সুখ-দুঃখের অনুভূতিগুলো। সে যখন পরীক্ষার হলে ব্যর্থ হয়, সমাজ তাকে বিচার করে শুধু একটি গ্রেড কার্ড দিয়ে। কেউ তার চোখের নিচে জমে থাকা সেই কালিগুলো পড়ে দেখে না, যা হাজারো নির্ঘুম রাতের সাক্ষী।
  • খ) প্রত্যাশার হিমশৈল: পরিবার আর সমাজের কাছে সে কেবল একজন ‘ভবিষ্যৎ ডাক্তার’—এক আশ্চর্য জাদুর কাঠি। তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় নিখুঁত হওয়ার বোঝা। তাকে ব্যর্থ হওয়ার অধিকার দেওয়া হয় না। মা-বাবার ‘গর্ব’ হওয়ার সেই অসহ্য চাপই অনেক সময় তাকে দড়ির শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড় করায়। অথচ কেউ তাকে জড়িয়ে ধরে বলে না, “তুমি ডাক্তার হতে না পারলেও আমাদের সন্তান হিসেবেই তুমি শ্রেষ্ঠ।”

কেন এই আত্মহত্যার তৃষ্ণা?

গবেষণা বলছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় বহুগুণ বেশি। কেন সেই হাতগুলো নিজের কণ্ঠনালী চেপে ধরে, যে হাতগুলো একদিন মরণোত্তর জীবনের সঞ্চার করবে? এর উত্তর কোনো প্যাথলজি রিপোর্টে পাওয়া যাবে না। এর উত্তর লুকিয়ে আছে সেই গভীর একাকীত্বের মাঝে, যেখানে চারপাশের মানুষগুলো প্রতিযোগী হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু সহমর্মী হয় না। যেখানে শিক্ষকের ধমক আর সমাজের বিদ্রূপ মিলেমিশে একজন মেধাবীকে হীনম্মন্যতার অতলে ডুবিয়ে দেয়। সে ভুলে যায় যে, জীবনটা কোনো পরীক্ষা নয়—জীবনটা একটা দীর্ঘ যাত্রা।

একটি অদৃশ্য কথোপকথন, এবার হৃদয়ের কান পাতো

কল্পনা করো, তুমি আজ নেই। কাল সকালে তোমার সেই সাদা অ্যাপ্রনটা তোমার নিথর দেহের ওপর ঢাকা দেওয়া হবে। তোমার মা যখন সেই অ্যাপ্রনটা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠবেন, সেই কান্নার শব্দ কি তোমার কানে পৌঁছাবে? তোমার বাবা, যিনি হয়তো বাইরে থেকে অনেক শক্ত মানুষ, তিনি প্রতিদিন আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে খুনি ভাববেন। তোমার শূন্য কক্ষটি এক অবিনশ্বর হাহাকারের রাজপ্রাসাদ হয়ে থাকবে।

তুমি কি জানো, তোমার এই প্রস্থানের ফলে কতগুলো হাসিমুখ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হলো? বিশ বছর পর কোনো এক নির্জন রাতে এক আর্তমানব তোমার অপেক্ষায় থাকত, যার জীবন কেবল তোমার বুদ্ধিমত্তাতেই রক্ষা পেত। তুমি আজ চলে গেলে সেই ভবিষ্যৎ প্রাণগুলোর খুনি কি তুমি নিজেই হয়ে যাচ্ছ না?

জীবনের মহাকাব্যিক পুনরুদ্ধার

জীবন সবসময় সরলরেখায় চলে না। জীবন অনেক সময় বাঁক নেয়, হোঁচট খায়। কিন্তু এই হোঁচট খাওয়াই তো শেষ নয়। আজ যে তুমি কাঁদছো, কাল হয়তো তুমিই হবে কারো চোখের জল মোছার অবলম্বন।

  • ক) ব্যর্থতা একটি পাঠমাত্র: একটা প্রফ-এ ফেল করা মানেই পৃথিবীর শেষ সীমানায় পৌঁছে যাওয়া নয়। ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক মানুষের নাম আছে যারা বারবার ব্যর্থ হয়েও শেষ পর্যন্ত পৃথিবীকে বদলে দিয়েছেন। তোমার স্টাডি টেবিলের ওই বইগুলো তোমাকে বিজ্ঞানের সূত্র শেখাতে পারে, কিন্তু জীবনের সূত্র শিখতে হয় লড়াই করে।
  • খ) সহমর্মিতার শক্তি: তুমি যদি আজ ভেঙে পড়ো, তবে কাউকে বলো। কথা বলো তোমার সেই বন্ধুর সাথে, যে হয়তো তোমার মতোই একই যন্ত্রণায় পুড়ছে। একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস, একটি আলিঙ্গন—কখনো কখনো একটি আস্ত হাসপাতালের চেয়েও বড় ঔষধ হয়ে দাঁড়ায়।

এখন একটু থামো, এক মুহূর্তের জন্য স্থির হও!

এই লেখা যদি তুমি পড়ো, তবে এক মিনিট চোখ বন্ধ করো। নিজেকে কল্পনা করো আজ থেকে দশ বছর পরের কোনো এক সময়ে। তুমি তখন পূর্ণাঙ্গ একজন চিকিৎসক। তোমার সামনে শুয়ে আছে এক মৃত্যুপথযাত্রী শিশু। শিশুটির মা-বাবা তোমার দিকে তাকিয়ে আছেন—ঠিক যেমন করে তৃষ্ণার্ত মানুষ চাতক পাখির মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।

তুমি পরম মমতায় শিশুটির কপালে হাত রাখলে। তোমার চিকিৎসায় শিশুটি চোখ মেলে তাকালো। সেই মুহূর্তে ওই শিশুটির চোখের মনিতে তুমি নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাবে। সেই আনন্দ, সেই সার্থকতা—তার দাম কি কোনো পরীক্ষার গ্রেড কার্ড দিয়ে মেটানো সম্ভব?

তুমি যদি আজ নিজেকে শেষ করে দিতে, তবে সেই শিশুটি কি কোনোদিন পৃথিবীর আলো দেখতে পেত? পৃথিবী হয়তো থেমে যেত না, কিন্তু পৃথিবীর একটি পরম অলৌকিক মুহূর্ত হারিয়ে যেত চিরতরে।

বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় বিপ্লব

জীবন অদ্ভুত। এটি যেমন নিষ্ঠুর, তেমনই এটি পুনরুদ্ধারক্ষম। আজ যে ছাত্রটি অপমানে আর ডিপ্রেশনে কুঁকড়ে আছে, কাল সেই একই মানুষ আইসিইউতে দাঁড়িয়ে কারো শেষ আশা হয়ে ওঠে। মানুষের জীবনে অর্থ আসে ধীরে ধীরে, প্রাপ্তি দিয়ে নয়—অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা দিয়ে।

তুমি কোনো রোল নম্বর নও। তুমি কোনো ব্যর্থতার নাম নও। তুমি এমন একজন মানুষ, যার অস্তিত্বের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আগামীর অসংখ্য জীবন। আত্মহত্যা কোনো বীরত্ব নয়; বীরত্ব হলো বিষণ্নতার এই ঘন অন্ধকার ভেদ করে আরেকটি নতুন সকালের সূর্যের দিকে তাকিয়ে হাসা।

সাহায্য চাও। প্রিয় মানুষকে ফোন করো। চিৎকার করে কাঁদো—তাতেও ক্ষতি নেই। কিন্তু ফিরে এসো। কারণ তোমার হৃদস্পন্দন এই মহাবিশ্বের জন্য একটি বিশেষ সুর। সেই সুর থেমে গেলে মহাবিশ্বটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

তোমার ফিরে আসা জরুরি

একদিন তুমি বুঝবে, জীবনের সবচেয়ে কঠিন অপারেশনটি সার্জারি টেবিলে হয়নি; সেটি হয়েছিল তোমার মনের ভেতরে, যখন তুমি আত্মহননের চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে জীবনকে আলিঙ্গন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে। আর সেই অপারেশনে তুমি সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছো।

তুমি বেঁচে আছো। তুমি লড়াই করছো। তুমি বিজয়ী। এবার আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে দেখো। ওই চোখের গহীন কোণে তাকিয়ে বলো— “আমি থাকব। কারণ আমার থাকাটা জরুরি।”

সাদা অ্যাপ্রনটা আজ তুলে নাও। ওটা ডানা হিসেবে নয়, মানুষের কান্নার দাগ মোছার রুমাল হিসেবে ব্যবহার করবে বলে প্রতিজ্ঞা করো।

এই লেখাটি তোমার জন্য—যে আজ রাতেও বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *