স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণে চাই কাঠামোগত সংস্কার ও জনমুখী মানসিকতা

শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

একটি দেশের সুষম উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। কিন্তু আমাদের দেশে স্থানীয় সরকারের যে রূপ আমরা দেখি, তা অনেকাংশেই কেন্দ্রীয় সরকারের মুখাপেক্ষী এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বন্দি। সম্প্রতি দৈনিক জাহানে প্রকাশিত মোশাররফ হোসেন মুসার ‘স্থানীয় সরকার প্রকৌশল, না কেন্দ্রীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ?’ শীর্ষক নিবন্ধটি আমাদের এই ব্যবস্থার একটি গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে।

ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ বনাম কেন্দ্রীকরণ

নিবন্ধটিতে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে দেখানো হয়েছে যে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নামগতভাবে ‘স্থানীয়’ হলেও কার্যত এটি কেন্দ্রীয় সরকারের একটি বর্ধিত অংশ। জেলা পরিষদ বা উপজেলা পরিষদের নিজস্ব প্রকৌশল কাঠামো শক্তিশালী না করে বরং একটি কেন্দ্রীয় সমান্তরাল বিভাগ তৈরি করার মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পরিবর্তে প্রকারান্তরে কেন্দ্রীকরণকেই উৎসাহিত করা হয়েছে। এর ফলে উন্নয়নের ক্ষেত্রে ‘বটম-আপ’ বা নিচ থেকে উপরে যাওয়ার যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি থাকার কথা ছিল, তার বদলে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া বা ‘টপ-ডাউন’ পদ্ধতিই প্রাধান্য পাচ্ছে।

ঐতিহাসিক বিবর্তন ও বর্তমান পরনির্ভরশীলতা

আমাদের স্মরণে রাখা প্রয়োজন, ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলেও জেলা বোর্ড বা কাউন্সিলগুলোর হাতে যে পরিমাণ প্রশাসনিক ও প্রকৌশলগত ক্ষমতা ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে তা উত্তরোত্তর হ্রাস পেয়েছে। স্থানীয় সরকার ইউনিটগুলোর (ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলা পরিষদ) নিজস্ব কোনো শক্তিশালী প্রকৌশল ব্যবস্থা না থাকায় তারা উন্নয়নমূলক কাজের জন্য কেন্দ্রীয় এই বিভাগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফলে স্থানীয় মানুষের চাহিদা ও মতামতের প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থেকে যায়।

উত্তরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির আবশ্যকতা

এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা জরুরি। শুধু নামকাওয়াস্তে স্থানীয় সরকার নয়, বরং ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী এবং কারিগরিভাবে সক্ষম করে তুলতে হবে। এলজিইডি-র মতো বিশাল সংস্থাকে সরাসরি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে অথবা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব প্রকৌশল বিভাগ গড়ে তুলতে হবে।

উন্নয়ন ও জনগণের অংশগ্রহণ

উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তাঘাট বা ভবন নির্মাণ নয়; উন্নয়ন মানে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। আর এই অংশগ্রহণ তখনই সম্ভব যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হাতে থাকবে। আমলাতান্ত্রিক খবরদারি কমিয়ে স্থানীয় সরকারকে প্রকৃত অর্থেই ‘সরকার’ হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। নীতিনির্ধারক ও সুশীল সমাজের উচিত এই সংকীর্ণ মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার পথে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া। জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে এর কোনো বিকল্প নেই।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *