তৃতীয় পর্ব
শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

কত মানুষ তো এক টুকরো বৈধ দলিল ছাড়াই বংশপরম্পরায় জমি বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ পরম আরামে ভোগদখল করে বেঁচে থাকে! অথচ আমাদের এই পরম শ্রদ্ধেয় ও দূরদর্শী খালেক মাস্টার এবং তাঁর গুণগ্রাহী অনুসারী পক্ষের আইনি অনুশাসন পালনের কী এক অনন্য ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পড়ে রয়েছে, যা সাধারণের চোখে পড়ে না! তারা আইনকে না মেনে অবহেলা করা তো দূরের কথা, বরং আইনের প্রতি এতটাই পরম অনুগত যে—একবারের জায়গায় একাধিকবার আইনকে মানতে গিয়ে নিজেদের সামান্য বিড়ম্বনায় ফেলে দিয়েছেন! তাতে কী-ই বা আসে যায়? আইনেরও বোঝা উচিত, যে পক্ষ তাকে এত বেশি ভালোবাসে ও শ্রদ্ধার সাথে মেনে চলে, তাদের এই অতি-আনুগত্যকে একটু সহানুভূতির চোখেই দেখা শ্রেয়।
জোড়া দলিল: ২৪শে জানুয়ারি ও ২৩শে মার্চ ১৯৮৭
চলুন, এবার তাদের সেই আইনি অনুশাসনের চূড়ান্ত প্রকাশ—অর্থাৎ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নথিতে সংরক্ষিত জোড়া দলিল দুটিকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে তাঁদের এই পরম আইনপ্রীতির রূপরেখাটি একটু পরখ করা যাক।
নথিপত্র বলছে, ২৪শে জানুয়ারি ১৯৮৭। সেদিন আকুয়ার ওই ৬ শতাংশ জমির জন্য একটি প্রারম্ভিক দলিল (নং ৫৫৪৭) সম্পাদন করা হলো। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সচ্ছল নথিতে যেখানে সেই জমির মূল্য খোদ তাঁরাই পরম দায়িত্বে বসিয়েছিলেন ৯৫,০০০ টাকা! হিসাবটা খুবই পরিষ্কার—আকুয়া থেকে গোহাইলকান্দির মূল সম্পত্তির হাঁটাপথের দূরত্ব মাত্র চার থেকে পাঁচ মিনিট। সেই সুবাদে তৎকালীন আশির দশকের বাস্তব বাজারদরে ৬ শতাংশ জমির দাম ৯৫ হাজার টাকা হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক ও নিয়মমাফিক।
মূল্যের নাটকীয় পরিবর্তন: ৯৫ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা
কিন্তু এখানেই তাদের মহান উদারতা ও আইনের প্রতি অপরিসীম অনুরাগের আসল চমক! ঠিক দুই মাস পরে, অর্থাৎ ২৩শে মার্চ ১৯৮৭ সালে এসে সম্পাদিত হলো সেই ঐতিহাসিক ‘এওয়াজ বদলের ১৭৫৬ নম্বর দলিল’। আর কী আশ্চর্য ঘটনা! সেই ৯৫ হাজার টাকার জমিই দুই মাসের ব্যবধানে নতুন দলিলে এসে পরম আনন্দের সাথে মাত্র ৫,০০০ টাকার এক প্রতীকী মূল্যে নামিয়ে আনা হলো! মাত্র ৬০ দিনের ব্যবধানে একই জমির মূল্য এক লাফে ৯৫ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায় নামিয়ে এনে রেজিস্ট্রি ফি ও আইনি প্রক্রিয়াকে সুসম্পন্ন করার এই অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক অবদান কেবল এই দূরদর্শী পক্ষ দ্বারাই সম্ভব!

আইনি কাঠগড়ায় জোড়া দলিলের বিশ্লেষণ
এবার আসুন, আইনের সুদৃশ্য আয়নায় তাদের এই জোড়া দলিলের মহিমান্বিত অবস্থানটি একটু পরখ করে দেখি।
যেহেতু তারা আদালত থেকে শুরু করে সর্বত্র অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাঁদের এই ৫০০০ টাকার দলিলটিকেই (নং ১৭৫৬) প্রধান আইনি দলিল হিসেবে পেশ করেছেন, সেহেতু প্রথম দলিলটিকে (৫৫৪৭ নম্বর দলিল) আর ধরে রাখার প্রয়োজন মনে করেননি। কারণ, ভূমি ও আইনের স্বাভাবিক নিয়ম হলো—একজন মানুষ যখন পাক্কা দুই মাস আগে (২৪শে জানুয়ারি) আইনগতভাবে ওই সম্পত্তির সমর্পণপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ফেলেছেন, তখন দ্বিতীয়বার সেই একই সম্পদে হাত দেওয়া তো তাঁর অপরিসীম দায়িত্ববোধেরই এক বিরল বহিঃপ্রকাশ!
আইনের জালে ঘেরা দানশীলতা ও গ্রহীতার ভূমিকা
তবে বিচারিক কাঠগড়ায় দাঁড়ালে আইনপ্রেমের এই অতি-উৎসাহেই তৈরি হয় এক পরম কৌতূহল—পাক্কা ৬০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর, যে জমির ওপর নির্মল বাবুর আর নতুন করে আইনগত কিছু করার সুযোগ ছিল না, সেখানে পুনরায় ২৩শে মার্চ তারিখে ৫০০০ টাকার নতুন আরেকটি দলিল সম্পাদন করে তারা মূলত আইনকে দ্বিতীয়বার সম্মান জানানোর এক বিরল ইতিহাস গড়েছেন!
যদি তাঁদের প্রথম দলিলটি (৫৫৪৭ নম্বর) কার্যকর থেকে থাকে, তবে ষাট দিন পরের ৫০০০ টাকার চূড়ান্ত দলিলটি কেবল তাদের অতি-উৎসাহী আইনচর্চারই এক অনন্য নিদর্শন; আর যদি ৫০০০ টাকার দলিলটিই তাদের মূল ভিত্তি হয়ে থাকে, তবে তার দু’মাস আগের ৯৫,০০০ টাকার দলিলটি তাদের পরম সুবিন্যস্ত ব্যাকআপ পরিকল্পনারই এক অখণ্ড অংশ! আইনের প্রতিটি ধারাকে এত নিখুঁত ও বারবার আরাধনা করতে গিয়ে তাঁরা নিজেদের তৈরি করা অনুশাসনের সুদৃশ্য জালেই আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন—যেখানে তাঁদের দানশীলতা ও পরম গ্রহীতার ভূমিকা আজ ইতিহাসের পাতায় পাশাপাশি উদ্ভাসিত!