জুলাই হত্যাকাণ্ডের তথ্য নিয়ে লুকোচুরি: সিলেটের ডিসিকে আদালতের শোকজ কি প্রশাসনিক অন্তর্ঘাত?

স্টাফ রিপোর্টার

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সিলেটের গোলাপগঞ্জে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের সময় পুলিশের গুলিতে শহীদ তাজ উদ্দিন হত্যা মামলার তদন্তে এক নজিরবিহীন আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। মামলার তদন্তে প্রয়োজনীয় তথ্য—অর্থাৎ ওই দিন কোন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট গুলির আদেশ দিয়েছিলেন এবং কার উপস্থিতিতে বিজিবি বা পুলিশ অভিযান চালিয়েছিল—তা সরবরাহ করতে দীর্ঘসূত্রতার দায়ে সিলেটের বর্তমান জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছেন আদালত।

সিলেটের আমলি আদালত নম্বর-২-এর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সুদীপ্ত তালুকদার গত ৮ ফেব্রুয়ারি এই আদেশ জারি করেন। আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে এই বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার নেপথ্যে কি প্রশাসনিক অসহযোগিতা?

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মামলার তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) ২০২৫ সালের এপ্রিল মাস থেকেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একাধিকবার চিঠি পাঠিয়ে ওই দিনের দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেটের নাম ও নথিপত্র চেয়ে আসছিল। যদিও বিজিবি তাদের সদস্যদের তালিকা সরবরাহ করেছে, কিন্তু জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত এক বছরেও সেই দিনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নাম বা তথ্যাদি সরবরাহ করা হয়নি।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রশাসনের এই নিরবতা তদন্ত কাজে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে এবং এটি ‘আদালত অবমাননার শামিল’। গত ১৫ জুন ২০২৫ তারিখেও আদালত তথ্য সরবরাহের আদেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু তা অজানাই রয়ে গেছে।

ডিসি সারওয়ার আলমের ভূমিকা ও চক্রান্তের আশঙ্কা

প্রশ্ন উঠেছে, বর্তমান জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম কেন এই তথ্য সরবরাহ করছেন না? নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট যখন এই হত্যাকাণ্ড ঘটে, তখন সারওয়ার আলম সিলেটে কর্মরত ছিলেন না। তিনি তখন ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বিসিএস ২৭তম ব্যাচের একজন কর্মকর্তা, যিনি ইতিপূর্বে র‍্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সাহসিকতার জন্য ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন এবং তৎকালীন সরকারের আমলে কয়েক দফা পদোন্নতি বঞ্চিত ও বিভাগীয় ব্যবস্থার শিকার হয়েছিলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, সারওয়ার আলম নিজে জুলাই বিপ্লবের স্পিরিটের সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও তার প্রশাসনের নিচের স্তরের কর্মকর্তারা, যারা বিগত সরকারের অনুগত ছিলেন, তারা সম্ভবত নথিপত্র গায়েব বা তথ্য গোপন করে বর্তমান ডিসিকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করছেন। এটি একটি ‘আমলাতান্ত্রিক অন্তর্ঘাত’ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সংবাদ মাধ্যমের খণ্ডিত প্রচার ও বিভ্রান্তি

সাম্প্রতিক কিছু সংবাদ প্রতিবেদনে এমন আভাস দেওয়া হচ্ছে যেন সারওয়ার আলম নিজেই গুলির আদেশদাতা। অথচ জুলাই বিপ্লবের সময় তিনি মাঠ প্রশাসনেই ছিলেন না। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টার পিএস হিসেবে এক বছর সফলভাবে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট তিনি সিলেটের ডিসি হিসেবে যোগ দেন। ফলে অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা জেলা প্রশাসনের পুরনো সিন্ডিকেটের কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিচার বিভাগ বনাম নির্বাহী বিভাগ

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারক সুদীপ্ত তালুকদার কোনো ব্যক্তিকে নয়, বরং ‘জেলা প্রশাসক’ পদটিকে শোকজ করেছেন যাতে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই ফাইলটি খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিচার বিভাগীয় এই কঠোরতা মূলত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি অংশ।

শহীদ পরিবারের দাবি

নিহত তাজ উদ্দিনের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেড় বছর অতিবাহিত হলেও প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণে এখনো চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হয়নি। তারা অবিলম্বে সেই দিনের ‘শুটিং অর্ডার’ দেওয়া ম্যাজিস্ট্রেটের নাম জনসমক্ষে আনার এবং তাকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *