আফ্রিকার তেলাপিয়া কেন বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের ভরসা

ইয়াহইয়া নকিব, ঢাকা।

দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান আসে নানা ধরনের মাছ থেকে। সীমিত আয়ের মানুষের কাছে কম দামের মাছই আমিষের বড় উৎস। কম দামি মাছের মধ্যে পছন্দের শীর্ষে রয়েছে তেলাপিয়া মাছ, যা একসময় আফ্রিকা থেকে আনা হয়েছিল।

​গত এক দশকে দেশে তেলাপিয়ার উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৪৮ শতাংশ বা ১ লাখ ৪১ হাজার ৬১৬ টন। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে তেলাপিয়ার উৎপাদন ছিল ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৬৭৮ টন, যা এক দশক আগের ২ লাখ ৯৮ হাজার ৬২ টনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।

​তেলাপিয়া চাষে আগ্রহ বৃদ্ধির কারণ

​তেলাপিয়া চাষে আগ্রহ বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো:

​১. দ্রুত বড় হওয়া: তিন থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে এই মাছ বিক্রি উপযোগী হয়ে যায়।

২. কম যত্নে চাষ: কই, শিং ও পাবদা মাছের মতো তেলাপিয়ার জন্য আলাদা যত্নের প্রয়োজন হয় না।

৩. আবহাওয়া সহনশীলতা: গরম বা ঠান্ডা যেকোনো আবহাওয়ায় তেলাপিয়া চাষ করা যায়।

৪. চাহিদা: একদিকে যেমন চাহিদা বেড়েছে, তেমনি চাষিরা এখন মোনোসেক্স জাতের পুরুষ তেলাপিয়া চাষে আগ্রহী হচ্ছেন, কারণ এসব মাছ আকারে বড় হয়।

​উচ্চ দাম ও চাষিদের লোকসান

​উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়লেও তেলাপিয়া মাছের দাম এখনও নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে। গত এক বছরের ব্যবধানে পাইকারিতে তেলাপিয়া মাছের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং খুচরা পর্যায়ে প্রায় ৮০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে রাজধানীর বাজারগুলোতে আকারভেদে তেলাপিয়া কেজিপ্রতি ১৮০ থেকে ২৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

​বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের ডিন অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম সরদার জানান, মাছ উৎপাদনে ৭০ শতাংশ খরচই হয় খাবারের পেছনে। গত কয়েক বছরে খাবারের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন বাড়লেও দাম কমেনি।

​ময়মনিসংহের মাছচাষি নাহিম মাহমুদ জানান, মাছচাষিরা এখন সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছেন। মাছের খাবার, বিদ্যুৎ বিল, ওষুধ, শ্রমিকের খরচ, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ মিলিয়ে চাষিরা লোকসান গুনছেন। চাষির মুনাফা বৃদ্ধি না পাওয়ার জন্য তাঁরা ব্যাংকের উচ্চ সুদকে দায়ী করছেন।

​মাছ চাষের খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের

​তেলাপিয়ার যাত্রা ও বিতর্ক

​মৎস্য কর্মকর্তারা জানান, ১৯৬৯ সালে আফ্রিকা থেকে প্রথম দেশে আনা হয় তেলাপিয়া। তবে ২০১০ সালের পর এর ব্যাপক ভিত্তিতে বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়।

​শেওলা ও উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে বলে একসময় এটিকে গারবেজ/ট্র্যাশ ফিশ বা আবর্জনা মাছ বলেও ডাকা হতো। এক সময় এ মাছে নানা ক্ষতিকর পদার্থের উপস্থিতির অভিযোগও উঠেছিল। তবে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এবং গবেষকেরা বলছেন, মানসম্পন্ন খাবার দেওয়া হলে এ মাছে ক্ষতির কিছু নেই। বর্তমানে পুকুরে গোবর, হাঁস-মুরগির উচ্ছিষ্ট ব্যবহার করাও আইনিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

​তেলাপিয়া চাষে শীর্ষ ১০ জেলার মধ্যে রয়েছে: কুমিল্লা (শীর্ষে), ময়মনসিংহ, যশোর, চট্টগ্রাম এবং বরিশাল।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *