“ডেভিল হান্ট” এর নামে সমন্বয়কের ৬২ বছরের বৃদ্ধ বাবা কারাগারে
স্টাফ রিপোর্টার

কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর নামে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক জেনাস ভৌমিক এবং তার বৃদ্ধ বাবার ওপর চালানো মধ্যযুগীয় বর্বরতা ও মিথ্যা হয়রানির ঘটনা তদন্তে মাঠে নেমেছে ময়মনসিংহের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল। গতকাল তাড়াইল থানায় সরেজমিন পরিদর্শনে যান ময়মনসিংহ জেলা ও মহানগর বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং সিনিয়র সাংবাদিকরা।
প্রতিনিধি দলটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ জালাল উদ্দিনের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন এবং ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। এ সময় উপস্থিত নেতৃবৃন্দ পৃথক পৃথকভাবে তাদের ক্ষোভ ও দাবি তুলে ধরেন।
যাদের নেতৃত্বে তদন্ত
প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক জাহান-এর সম্পাদক ও প্রকাশক শেখ মেহেদী হাসান নাদিম, মহানগর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যুগ্ম আহবায়ক নাফিউল সুলতান রোহান, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ওয়ালিদ আহমেদ অলি এবং জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য সচিব আলী হোসেন।
নেতৃবৃন্দের বক্তব্য
সাংবাদিক ও সম্পাদক শেখ মেহেদী হাসান নাদিম (দৈনিক জাহান): “আমরা এখানে কোনো অনুরোধ করতে আসিনি, আমরা এসেছি সংবিধান লঙ্ঘনের জবাব চাইতে”। ১৫ ডিসেম্বর রাতে সিভিল ড্রেসে পুলিশ যে তাণ্ডব চালিয়েছে, তা দণ্ডবিধির ৩২৫ ও ৩২৬ ধারা অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ। একজন সমন্বয়ক ও তার বাবার কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরানো এবং দাঁত ভেঙে ফেলা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন (অনুচ্ছেদ ৩৫)। পুলিশ যদি মনে করে ‘মামলা আছে তাই ওয়ারেন্ট লাগে না’—এই খোঁড়া যুক্তি দিয়ে পার পাবে, তবে তারা ভুল ভাবছে। আমরা দণ্ডবিধির ২১১ ও ২২০ ধারায় পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাব। অপরাধী পুলিশ সদস্যদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ ও আদালত—কোনোটাই ছাড়ব না।”
ওয়ালিদ আহমেদ অলি (সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব, মহানগর): “জুলাই বিপ্লবের একজন সহযোদ্ধার গায়ে হাত তোলা মানে পুরো ছাত্র সমাজের গায়ে হাত তোলা। জেনাস যখন আমাদের জানায় যে তাকে ও তার বাবাকে কোনো কারণ ছাড়াই আটক করা হয়েছে, আমরা তখনই প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলে কথা বলেছি। ওসি সাহেবরা তখন বলেছিলেন তারা ‘ফুল দিতে যাচ্ছেন’, অথচ লকাপে আমাদের ভাই ধুঁকছিল। আমরা পরিষ্কার বলে দিতে চাই, ফ্যাসিবাদের দোসর হয়ে যারা পুলিশ বাহিনীতে এখনো ঘাপটি মেরে আছে, তাদের এই ‘ডেভিল হান্ট’ আমরা পাল্টা ‘জাস্টিস হান্ট’ দিয়ে রুখে দেব।”
নাফিউল সুলতান রোহান (যুগ্ম আহবায়ক, মহানগর): “যে ছাত্ররা বুকের রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে, আজ তাদেরকেই মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে। জেনাস ও তার বাবার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ যে সম্পূর্ণ বানোয়াট, তা আজ প্রমাণিত। আমরা দেখতে এসেছি, স্বাধীন দেশে পুলিশ জনগণের বন্ধু হয়েছে নাকি আগের মতোই লাঠিয়াল বাহিনী রয়ে গেছে। আমাদের দাবি স্পষ্ট—নির্যাতনকারী এসআই মহাইমিনুলসহ জড়িতদের অবিলম্বে সাসপেন্ড করতে হবে এবং জেনাসের চিকিৎসার সমস্ত দায়ভার নিতে হবে।”
আলী হোসেন (সদস্য সচিব, জেলা): “আমরা কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহের ছাত্ররা এক ও অভিন্ন। তাড়াইল থানার এই ঘটনা যদি আমরা বিনা বিচারে ছেড়ে দিই, তবে সারা দেশে ছাত্র সমন্বয়কদের ওপর এমন নির্যাতন শুরু হবে। আমরা ওসি সাহেবকে জানিয়েছি, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যদি আমরা দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না দেখি এবং মিথ্যা মামলার ষড়যন্ত্র বন্ধ না হয়, তবে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।”
পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য
ওসি মোঃ জালাল উদ্দিন (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, তাড়াইল থানা): প্রতিনিধি দলের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাড়াইল থানার ওসি মোঃ জালাল উদ্দিন বলেন, “বিষয়টি নিয়ে যেহেতু অভিযোগ উঠেছে, আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এটি দেখছি। আমি কথা দিচ্ছি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হবে। যদি আমার থানার কোনো অফিসার অতি উৎসাহী হয়ে কোনো বেআইনি কাজ করে থাকে বা অহেতুক বলপ্রয়োগ করে থাকে, তবে তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা চাই না পুলিশের সাথে ছাত্র-জনতার কোনো দূরত্ব তৈরি হোক। আমি ন্যায় বিচার নিশ্চিত করব।”
তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, তারা এই ঘটনার আইনি প্রক্রিয়ার শেষ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করবেন এবং কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেবেন।
