শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

করোনা মহামারীর জরুরি সময়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকার গুণগত মান অক্ষুণ্ণ রেখে কোল্ড-চেইনে সরবরাহের জন্য মার্কিন উন্নয়ন সংস্থা USAID-এর অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকারকে ১৮টি অত্যাধুনিক ফ্রিজার ভ্যান (রেফ্রিজারেটেড ট্রাক) উপহার দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন সরকারের নীতিপ্রণেতারা জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গাড়িগুলো গ্রহণ করে স্বাস্থ্য খাতের ‘বিরাট সাফল্য’ হিসেবে প্রচার করেছিলেন। কিন্তু মহামারী শেষ হতে না হতেই সঠিক দূরদর্শিতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবে কোটি কোটি টাকার এই বিশেষায়িত সম্পদগুলো এখন ধুলোবালি মেখে অলস পড়ে আছে।
ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন অফিসের চত্বরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা এমনই একটি বিশেষায়িত ফ্রিজার ভ্যানের চিত্র (ছবিতে দৃশ্যমান) দেশের স্বাস্থ্য খাতের চরম অব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিহীনতা ও জাতীয় সম্পদ অপচয়ের এক জ্বলন্ত দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক চমক বনাম বাস্তবতার চরম বৈপরীত্য
২০২১ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশে যখন এই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ফ্রিজার ভ্যানগুলো হস্তান্তর করা হয়, তখন এটিকে তৎকালীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব একটি বড় কূটনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত বিজয় হিসেবে তুলে ধরেছিল। মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে মহামারী মোকাবিলায় যে ১২১ মিলিয়ন ডলারের বেশি অনুদান দেওয়া হয়েছিল, এটি ছিল তারই অংশ।
বাস্তবতা হলো, ক্যামেরা ও প্রচারণার আলো নিভে যাওয়ার পরপরই এই প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব বা মহামারী-পরবর্তী সময়ে এগুলোকে কীভাবে কাজে লাগানো হবে, তা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন বা একীভূত নীতিমালা (Integrated Policy) তৈরি করা হয়নি। কোনো দূরদর্শী পরিকল্পনা ছাড়াই আন্তর্জাতিক অনুদান গ্রহণ করার আমলানির্ভর রাজনৈতিক প্রবণতার কারণেই আজ এই আধুনিক গাড়িগুলো জেলা শহরগুলোর স্বাস্থ্য দপ্তরে বছরের পর বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে।
প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও বন্ধ অবস্থার কারণসমূহ
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গাড়িগুলো এভাবে অলস পড়ে থাকার পেছনে মূলত তিনটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক কারণ রয়েছে:
- রুটিন ভ্যাকসিনের নিজস্ব কোল্ড-চেইন: বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI)-এর নিজস্ব এবং স্থায়ী আঞ্চলিক কোল্ড-স্টোরেজ নেটওয়ার্ক রয়েছে। নিয়মিত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ছোট কোল্ড বক্সের মাধ্যমে ভ্যাকসিন পাঠানো হয়। ফলে সাধারণ সময়ে এই বিশাল ফ্রিজার ভ্যানগুলোর দৈনিক চাহিদাই তৈরি হয়নি।
- আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য: এই বিশেষায়িত গাড়িগুলো চালাতে সাধারণ গাড়ির চেয়ে অনেক বেশি জ্বালানি খরচ হয়, কারণ ইঞ্জিন ও ফ্রিজিং ইউনিট একযোগে চালু রাখতে হয়। গণটিকাদান তহবিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সাধারণ রাজস্ব খাত থেকে এই গাড়িগুলোর জন্য নিয়মিত বড় অঙ্কের জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট বরাদ্দ করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
- তদারকির অভাব: গাড়িগুলো সরাসরি বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হলেও, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর স্থানীয় পর্যায়ে লজিস্টিক সাপোর্ট ও পার্টনারদের মনিটরিং ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
বাজেট অপচয়ের আনুমানিক পরিসংখ্যান (লুকানো ব্যয়ের খতিয়ান)
গাড়িগুলো রাস্তায় না চললেও রাষ্ট্রকে প্রতি মাসে ও প্রতি বছরে একটি বড় অঙ্কের আর্থিক লোকসান গুনতে হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না। নিচে এর একটি আনুমানিক খতিয়ান দেওয়া হলো:
- গাড়ির অবচয় মূল্য (Depreciation Cost): প্রতিটি কোরিয়ান হুন্দাই (Hyundai Mighty EX8) আধুনিক ফ্রিজার ভ্যানের আনুমানিক বাজারমূল্য ও কোল্ড-চেইন ইকুইপমেন্টসহ প্রায় ৮০ লক্ষ থেকে ১ কোটি টাকা। ১৮টি গাড়ির মোট মূল্য প্রায় ১৮ কোটি টাকা। গাড়িগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় মেকানিক্যাল যন্ত্রাংশ, দামি ব্যাটারি, টায়ার এবং বিশেষায়িত রেফ্রিজারেশন কম্প্রেসর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বার্ষিক ১০% অবচয় ধরলেও প্রতি বছর প্রায় ১.৮ কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদের স্থায়ী ক্ষতি হচ্ছে।
- জনবল ও বেতন অপচয়: গাড়িগুলোর জন্য নিয়োজিত বা সংযুক্ত চালক ও সহযোগীদের প্রতি মাসে গড়ে ৩০,০০০ টাকা (বেতন ও ভাতা) দিলে, বছরে শুধু বেতন বাবদ খরচ হচ্ছে প্রায় ৬৪ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা। অথচ তাদের কাছ থেকে কোনো আউটপুট পাওয়া যাচ্ছে না।
- রক্ষণাবেক্ষণ ও পার্কিং ক্ষতি: খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে পড়ে থাকার কারণে গাড়িগুলোর বডি ও রং নষ্ট হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে সচল করতে গেলে নতুন করে বিপুল সংস্কার বাজেটের প্রয়োজন হবে।
চালকদের কর্মহীনতা ও অলস বসে থাকা
প্রকল্পের অধীনে নিয়োজিত বা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে সংযুক্ত করা চালকরা এখন সম্পূর্ণ কর্মহীন অলস সময় পার করছেন।
- বসে বসে তেল নেওয়ার সুযোগ নেই: সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতি লিটার জ্বালানির হিসাব লগবুকে তুলতে হয়। গাড়ি না চললে তেল উত্তোলনের সুযোগ নেই, ফলে চালকদের সরাসরি ফুয়েল চুরির সুযোগ না থাকলেও গাড়ির দামি ব্যাটারি ও ইঞ্জিন অকেজো হয়ে যাচ্ছে।
- বিকল্প ব্যবহারের অভাব: চালকরা সরকারি স্থায়ী কর্মী বা দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের আওতাভুক্ত হওয়ায় নিয়মিত মূল বেতন পাচ্ছেন। ডিউটি না থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিকল্প কাজে (যেমন স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সাধারণ পাজেরো বা অ্যাম্বুলেন্স চালানো) তাদের খুব কমই ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে দক্ষ জনবলের বড় অপচয় ঘটছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও বিকল্প ব্যবহারের তাগিদ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাষ্ট্রীয় এই অমূল্য সম্পদগুলোকে রাজনৈতিক অবহেলা ও আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতায় ফেলে রাখা এক ধরনের জাতীয় অপরাধ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত অবিলম্বে এই গাড়িগুলোকে শুধু টিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনরক্ষাকারী ইনসুলিন, ল্যাবরেটরি রিএজেন্ট, রক্ত, প্লাজমা কিংবা সরকারি হাসপাতালের কালচার প্রতিরোধী দামি থেরাপিউটিক ড্রাগ দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে স্থানান্তরের কাজে দ্রুত যুক্ত করা।
সমন্বিত নীতিমালা তৈরি করে এগুলোকে সাধারণ লজিস্টিক চেইনে যুক্ত না করলে, অনুদানের এই আধুনিক প্রযুক্তি একসময় সাধারণ স্ক্র্যাপ বা ভাঙাড়ি হিসেবেই সরকারি গ্যারেজে পরিত্যক্ত লোহার স্তূপে পরিণত হবে।