অকার্যকর স্থানীয় সরকার ও ভিজিএফ চাল বিতরণে বিশৃঙ্খলা
মোশাররফ হোসেন মুসা

প্রতি বছর পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা উপলক্ষে দুঃস্থ পরিবারের মাঝে ভিজিএফ চাল (Vulnerable Group Feeding) বিতরণ করা হয়। এবারও নতুন সরকার মোট ১ কোটি ৩৩ লাখ ৫৪০ টি কার্ডের বিপরীতে ১ লাখ ৩০.৫৪০ মে. টন চাল বরাদ্দ দিয়েছেন। প্রতি কার্ডধারী ১০ কেজি হারে চাল পাবে। ঈদের আগে চাল বিতরণ সম্পন্ন করার নির্দেশনা থাকায় অধিকাংশ এলাকায় গত ১৫ মার্চ থেকে চাল বিতরণ করা হয়েছে।
বিতরণ প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব
কিন্তু সকল জেলায় কোনো না কোনো ইউনিয়ন ও পৌরসভায় চাল বিতরণে বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া গেছে। পত্রিকা সূত্রে জানা গেছে—কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, বরিশাল, জামালপুর, পাবনার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে রাজনৈতিক মতানৈক্য সৃষ্টি হওয়ায় চাল বিতরণ স্থগিত রাখা হয়েছে। অত্র নিবন্ধকার একটি উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন ঘুরে ঘটনার সত্যতা কাছ থেকে দেখেছেন। স্থানীয় এমপি জামায়াতে ইসলামীর হওয়ায় তাদের জন্য ২০% কার্ড বরাদ্দ দেওয়া হয়। বিএনপি’র বক্তব্য তাদের দল ক্ষমতায়, সে কারণে জামায়াতের দ্বিগুণ তথা তাদেরকে ৪০% কার্ড দিতে হবে। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মীরাও ১০% দাবি করেন। ফলে কয়েকটি ইউনিয়নে চাল বিতরণ বন্ধ রাখতে হয়। পরে উপজেলা প্রশাসন দুটি রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও চেয়ারম্যান-মেম্বরদের ডেকে উদ্ভূত পরিস্থিতির মীমাংসা করে দেন।
প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ও বিধিমালার লঙ্ঘন
যদিও অধিকাংশ ইউনিয়নে চেয়ারম্যান ও পৌরসভায় মেয়র না থাকায় প্রশাসক নিয়োগ করে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাগুলো সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ভিজিএফ কার্ড বাছাই ও চাল বিতরণে সরকারের বিধিমালা খোদ সরকারের এমপিরাই মান্য করছেন না। লালমনিরহাটের এক এমপি চেয়ারম্যানকে ফোন করে তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের ২৫% কার্ড দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ভিজিএফ, ভিজিডি ও অন্যান্য ত্রাণ বিতরণে সরকারের বিধিমালায় সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে, কমিটির সভাপতি হবেন চেয়ারম্যান ও সদস্য সচিব হবেন ইউপি সচিব (ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা) এবং মেম্বররা হবেন সদস্য। তবে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে ১ জন নারী ও ১ জন পুরুষকে সদস্য করার কথা বলা আছে (এ নিয়মের সূত্র ধরে সরকারি দলের কর্মীরা কমিটিতে ঢোকার সুযোগ পান)। তাছাড়া দুঃস্থ ব্যক্তিদের বাছাই সভায় ও চাল বিতরণের দিনে একজন রিলিফ অফিসার উপস্থিত থাকবেন (উপজেলা প্রশাসন রিলিফ অফিসার নিযুক্ত করে থাকেন)।
কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় দায়বদ্ধতা
শুধু ভিজিএফ বিতরণ নয়, অন্যান্য সুবিধাভোগী কর্মসূচি তথা বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা বাছাইয়ের বেলাতেও একই নিয়ম রয়েছে। তার মানে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাহী বিভাগের প্রভুত্ব অদৃশ্য থাকায় কোনো অনিয়ম হলেই চেয়ারম্যান-মেম্বরকে দায়ী করা হয়। জনগণেরও মাইন্ডসেট হলো—চেয়ারম্যান-মেম্বররা সব খেয়ে ফেলে।
বর্তমান বিএনপি সরকার নির্বাচনের আগে ৩১ দফা বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন। সেখানে ২১ নম্বর দফায় স্থানীয় সরকার ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কথা উল্লেখ আছে। কাজেই দুই প্রকারের সরকার তথা কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থা ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সমাধান দিতে পারে। জাতীয় ও বৈশ্বিক কাজ কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য নির্দিষ্ট থাকবে এবং যাবতীয় স্থানীয় কাজ স্থানীয় সরকারের হাতে ছেড়ে দিতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথ
স্থানীয় সরকারগুলো একক ক্ষমতাবলে অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে। কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি হলে কেন্দ্রীয় সরকার তদন্ত সাপেক্ষে পদক্ষেপ নিবে। মনে রাখা দরকার, একটি শিশুকে হাঁটা শেখানোর আগে পিতা-মাতা আঙুল ধরে রাখে। পিতা-মাতা যদি সারাজীবন আঙুল ধরে রাখেন, তাহলে কোনোদিনই ওই শিশু নিজ পায়ে স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটা শিখতে পারবে না। তেমনি দীর্ঘবছর যাবৎ স্থানীয় সরকারগুলোকে অধীনস্থ করে রাখায় প্রতিনিধিরাও দায়িত্ববান হতে পারছেন না।
