ময়মনসিংহে কোটি টাকার নকল সিগারেট উদ্ধারে ভ্যাট কর্মকর্তার পকেট থেকে চাকরি বাঁচানোর মহাকাব্য!

​রেজাউল করিম, ময়মনসিংহ

​ময়মনসিংহের গাগড়া ইউনিয়ন থেকে সম্প্রতি এক চোখ ধাঁধানো ‘গোপন’ অভিযান চালিয়ে প্রায় কোটি টাকার নকল সিগারেট ও সিলিং মেশিন জব্দ করেছে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগ। তবে এই বিশাল অভিযানের আসল সৌন্দর্য হলো—অভিযান হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মূল অপরাধী বা কারখানার মালিকের দেখা মেলেনি! আর এই অলৌকিক অভিযানের মূল কারিগর, ময়মনসিংহের ভ্যাট বিভাগের হিরো অব দ্য ইয়ার—বিভাগীয় সহকারী কমিশনার মো. ফিরোজ হোসেন বিশ্বাস। রাষ্ট্রের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থাকে এক ফুয়ে উড়িয়ে দেওয়া এবং নিজের পকেটের লাখ লাখ টাকা খরচ করে চাকরি বাঁচানোর এই গল্প এখন ময়মনসিংহের চায়ের কাপে ঝড় তুলেছে।

​”তোদেরকে তথ্য কেন দেবো?”—গোয়েন্দাদের প্রতি ভ্যাট মহারাজের বাণী

​রাষ্ট্রের অর্থনীতির সুরক্ষায় এনএসআই আর ডিজিএফআইয়ের মতো রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দিনরাত এক করে তথ্য জোগাড় করে ভ্যাট বিভাগকে দিল। কিন্তু সহকারী কমিশনার ফিরোজ হোসেন বিশ্বাস কি আর চুনোপুঁটি নাকি যে গোয়েন্দাদের পাত্তা দেবেন? যৌথ অভিযানের বালাই দূরে ঠেলে তিনি নিজেই একা মাঠে নামলেন।

​পরবর্তীতে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন যখন একটু কৌতূহলবশত জানতে চাইল, “স্যার, অভিযান তো করলেন, আমাদের একটু জানাবেন তো?”—তখন আমাদের এই ক্ষুরধার কর্মকর্তা একেবারে চাণক্য নীতি প্রয়োগ করে সোজাসাপ্টা শুনিয়ে দিলেন: “তোদেরকে এই তথ্য কেন দিতে হবে?”

​বাহ! কী দারুণ রাষ্ট্রীয় সমন্বয়! নিজের ঢাক নিজে পেটাতে গিয়ে গোয়েন্দাদের পাত্তাই দিলেন না তিনি।

​অভিযান হলো এসআই দিয়ে, কিন্তু নাম তোলার দায় কার?

​কোটি টাকার এত বড় এবং ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে ভ্যাট সাহেব সঙ্গে নিলেন কোতোয়ালি থানার মাত্র একজন এসআইকে! আর ঘটনাস্থলে গিয়ে ভাগ্যের জোরে টহল পুলিশের আরও এক এএসআইকে পেয়ে গেলেন।

​সাংবাদিকরা যখন একটু কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলেন, “স্যার, আপনাদের সঙ্গে যে বীর বাহাদুর পুলিশ অফিসাররা ছিলেন, তাঁদের নামগুলো একটু বলেন না!”—তখন ভ্যাট মহারাজের চোখ কপালে ওঠার দশা। তিনি একগাল হেসে জানিয়ে দিলেন, নাম-টাম তাঁর মনে নেই বা পাওয়া যাচ্ছে না! তবে কি অদৃশ্য কোনো শক্তি বা জিনের বাদশাহরা এসে সিলগালা করে গেল? তিনি কেবল সগর্বে জানালেন, জব্দ তালিকায় তাঁদের সই আছে ভাই!

​প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তার এমন স্মরণশক্তি দেখে কার না হিংসা হবে!

​পকেট থেকে লাখ টাকা খরচ, নাকি চাকরি বাঁচানোর নাটক?

​অভিযানে ২৮ বস্তা নেভি, ৪ বস্তা রয়্যাল, স্টার, মনসুন আর খোলা সিগারেটসহ প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকার মালামাল উদ্ধার হলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বিশাল কারখানায় কোনো মালিকের দেখা মিলল না! তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকতে হলো।

​এখানেই শেষ নয়, সহকারী কমিশনার ফিরোজ সাহেব এক অভাবনীয় আত্মত্যাগ ও রূপকথার গল্প শোনালেন। তাঁর দাবি—এই গোপন তথ্য জোগাড় করতে নাকি তাঁর নিজের পকেট থেকে কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে! শুধুই কি তাই? তিনি এমন ভাব করলেন যে, এই লাখ লাখ টাকা খরচ করে যদি তিনি তথ্যটা না আনতেন, তবে তাঁর চাকরিটা আস্ত থাকত না! মানে দাঁড়াল—চাকরি বাঁচাতে তিনি নিজেই এখন গোয়েন্দা প্রধানের চেয়েও বড় গোয়েন্দা! টাকার অংকে চাকরি রক্ষা পাওয়ার এই অভাবনীয় আবিষ্কারের জন্য তাঁকে শান্তিতে নোবেল দেওয়া উচিত।

​আসল ব্র্যান্ডগুলোর কপাল পোড়া, আর ভ্যাট সাহেবের লঙ্কা কান্ড

​নেভি, রয়্যাল বা স্টারের মতো যে সব কোম্পানি কোটি কোটি টাকা ভ্যাট দিয়ে বৈধভাবে ব্যবসা করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, তাঁদের ব্র্যান্ডের নাম ভাঙিয়ে দিব্যি নকল সিগারেট বাজারে ছাড়া হচ্ছিল। নিয়ম অনুযায়ী ওই কোম্পানিগুলোকে ডেকে একটা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কিন্তু ভ্যাট সাহেব প্রেস রিলিজ দূরের কথা, কাউকে টু শব্দটিও পর্যন্ত করতে দেননি। কারণ, প্রেস রিলিজ দিলে তো আর পকেট খরচের গল্পগুলো মাটি হয়ে যাবে!

​সাংবাদিকদের মুখোমুখি এবং গ্র্যান্ড ফিনালে

​অবশেষে যখন ময়মনসিংহের ছয়জন অনুসন্ধিৎসু সাংবাদিক ভ্যাট দপ্তরে হাজির হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার, এত বড় একটা ঘটনা ঘটল, মিডিয়াকে বা জাতিকে একটু জানালেন না কেন?”—তখন ভ্যাট মহারাজ চিরচেনা মহিমায় জানিয়ে দিলেন, এসব মিডিয়ায় জানানোর কোনো নিয়মই নেই!

​কিন্তু শেষরক্ষা আর হলো কোথায়? সাংবাদিকদের একের পর এক সার্থক ও যৌক্তিক জেরার মুখে পড়ে তাঁর সুর নরম হয়ে এল। আত্মপক্ষ সমর্থনের সব বেলুন চুপসে গিয়ে তিনি নিজেই একপর্যায়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বীকার করলেন—“আমি নিজেই এখন এই বিষয় নিয়ে খুব ঝামেলার মধ্যে আছি।”

​পকেট থেকে লাখ টাকা খরচ করে চাকরি বাঁচানো, গোয়েন্দাদের ধমকানো আর মালিকহীন কারখানার কোটি টাকার সিগারেট উদ্ধারের এই রহস্যময় থ্রিলার নাটক ময়মনসিংহের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে। সচেতন মহল এখন শুধুই এটা ভাবছে—পরের সিজনে এই নাটকের সিক্যুয়েল কী আসে!