আদালতের রায় বনাম এসিল্যান্ডের নামজারি: মালিকানা নির্ধারণের প্রকৃত আইনি এখতিয়ার

​শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

​সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশের ভূ-সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেওয়ানি আদালতে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার পর বা কোনো আইনি ভিত্তি না থাকার পরেও একটি পরাজিত চক্র সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড কার্যালয় থেকে বিভিন্ন কৌশলে নামজারি ও জমাখারিজ করিয়ে নেয়। এরপর তারা সেই প্রশাসনিক কাগজ বা ভূমি সহকারী কর্মকর্তার তৈরি খতিয়ানকে হাতিয়ার বানিয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় ও ডিক্রিকে তাচ্ছিল্যের সুরে উপস্থাপন করে। সাধারণ মানুষের আইনি অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে এই চক্রটি নিজেদের জমির হিসেবে জাহির করার অপচেষ্টা চালায়। অথচ দেশের প্রচলিত আইন ও উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, এসিল্যান্ডের নামজারি কোনোমতেই মালিকানার চূড়ান্ত দলিল নয়। এই বিভ্রান্তি নিরসনে আইনি বিধান এবং উচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক নজিরসমূহ নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

​সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান ও ধারা

  • ​দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ এর ধারা ৯ (Section 9 of the CPC): আইন অনুযায়ী, যেকোনো স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির স্বত্ব, অধিকার, মালিকানা এবং না-দাবি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির একচ্ছত্র ও চূড়ান্ত এখতিয়ার কেবল দেওয়ানি আদালতের (Civil Court) রয়েছে। দেওয়ানি আদালত ছাড়া অন্য কোনো প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ বা রাজস্ব কর্মকর্তার মালিকানা নির্ধারণের কোনো আইনি এখতিয়ার নেই।
  • ​সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ এর ধারা ৪২ (Section 42 of the Specific Relief Act): আইনগতভাবে সম্পত্তির স্বত্ব ঘোষণা (Declaration of Title) পাওয়ার একমাত্র আইনি মাধ্যম হলো দেওয়ানি আদালতে সুনির্দিষ্ট মোকদ্দমা দায়ের করা। কোনো প্রশাসনিক বা ভূমি অফিস বা এসিল্যান্ডের কার্যালয় কারও অনুকূলে আইনি স্বত্ব বা মালিকানা সৃষ্টি করতে পারে না।
  • ​ভূমি ব্যবস্থাপনা ও নামজারি বিধিমালা: সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড কিংবা ভূমি অফিসের কাজ হলো কেবল রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে নামজারি (Mutation) বা রেকর্ড হালনাগাদ করা। নামজারি বা ভূমি রেকর্ড নতুন কোনো স্বত্ব বা মালিকানা তৈরি বা ধ্বংস করতে পারে না; এটি কেবল দেওয়ানি আদালতের চূড়ান্ত রায়ের অধীন একটি প্রশাসনিক এন্ট্রি মাত্র।

​মালিকানা বনাম নামজারি: উচ্চ আদালতের সুপ্রতিষ্ঠিত নজিরসমূহ

​বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ বিভিন্ন ঐতিহাসিক রায়ে বারবার স্পষ্ট করেছেন যে, প্রশাসনিক বা রাজস্ব রেকর্ড কখনো দেওয়ানি আদালতের বিচারিক রায়ের ওপর প্রাধান্য পেতে পারে না:

  • ​১৯ ডিএলআর ৯ এবং ৩৮ ডিএলআর ২৭০: এই রায়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, নামজারি বা মিউটেশন কোনো স্বত্ব বা মালিকানার দলিল নয়। এটি কেবল রাজস্ব আদayasের একটি প্রশাসনিক মাধ্যম। এসিল্যান্ড বা ভূমি অফিসের যেকোনো নামজারি বা রেকর্ড সর্বদা দেওয়ানি আদালতের চূড়ান্ত ডিক্রি বা আদেশের অধীন থাকবে (Subject to the decree of a Civil Court)।
  • ​৫৯ ডিএলআর ২০৭ (ঢাকা সিটি কর্পোরেশন বনাম শামসুর রহমান): এই আদেশে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে যে, খতিয়ান বা নামজারি কখনো স্বত্বের চূড়ান্ত প্রমাণপত্র হতে পারে না। জমির প্রকৃত মালিকানা ও স্বত্ব নির্ধারণের একমাত্র এখতিয়ার কেবল দেওয়ানি আদালতেরই রয়েছে।
  • ​১৫.১ এসসিওবি [এইচসিডি] ৯৯: এই গুরুত্বপূর্ণ রায়ে হাইকোর্ট বিভাগ নির্দেশ দিয়েছেন যে, যখন কোনো সম্পত্তি নিয়ে দেওয়ানি আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকে কিংবা আদালতের সুনির্দিষ্ট রায় ও ডিক্রি বিদ্যমান থাকে, তখন এসিল্যান্ড বা কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তার একতরফাভাবে বা এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে খতিয়ান পরিবর্তন বা নামজারি করার কোনো আইনি অধিকার নেই।

​দেওয়ানি আদালতের বিচারিক রায়ে পরাজিত হয়ে এসিল্যান্ড অফিস থেকে হাসিল করা নামজারি বা খতিয়ানকে জমির মালিকানার মূল দলিল হিসেবে দাবি করা সম্পূর্ণ বেআইনি, অবান্তর ও আদালত অবমাননার শামিল। এসিল্যান্ডের রায় বা নামজারি কখনোই দেওয়ানি আদালতের চূড়ান্ত ডিক্রির বিকল্প হতে পারে না। বিচারিক আদালত ও উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমেই কেবল সম্পত্তির প্রকৃত স্বত্ব ও মালিকানা নির্ধারিত হয়। সুতরাং, প্রশাসনিক কারসাজির মাধ্যমে মালিকানা দাবির এই হীন মানসিকতা পরিহার করে দেশের আইন এবং আদালতের মর্যাদাকে সমুন্নত রাখা প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য।