মাদরাসায় দায়িত্ব পালন না করেও ১৩ বছর বেতন-ভাতা, তদন্তের পর এমপিও বাতিল

​মনজুরুল হক, শেরপুর প্রতিনিধি

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার কালাকুড়া নেছারিয়া দাখিল মাদরাসায় অফিস সহকারী পদে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে মোবারক হোসেন নামে এক কর্মচারীর এমপিও বাতিল করা হয়েছে। সরকারি তদন্তে তাঁর নিয়োগে চরম অসংগতি ও জালিয়াতি ধরা পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, মাদরাসায় একদিনও দায়িত্ব পালন না করে তিনি দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে অবৈধভাবে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করে আসছিলেন।

​এ ঘটনায় তৎকালীন সহকারী সুপার এবং বর্তমানে উপজেলার কলসপাড় নঈমী দাখিল মাদরাসার সুপার মাওলানা আব্দুস সামাদের বিরুদ্ধে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় জালিয়াতি ও জাল স্বাক্ষর ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

​সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে কালাকুড়া নেছারিয়া দাখিল মাদরাসায় অফিস সহকারী পদে মোবারক হোসেনের নিয়োগ হয়। তৎকালীন সহকারী সুপার মাওলানা আব্দুস সামাদ ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, স্বাক্ষর জালিয়াতি ও মনগড়া নিয়োগ কমিটি গঠনের মাধ্যমে অবৈধভাবে এই নিয়োগ সম্পন্ন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে মোবারক হোসেনকে এমপিওভুক্ত করা হয়।

​জালিয়াতি উন্মোচন ও বঞ্চিত কর্মচারীর অভিযোগ

​একই পদে প্রকৃত নিয়োগপ্রাপ্ত অফিস সহকারী আবু বক্কর সিদ্দিককে জুনিয়র শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেখিয়ে এমপিওভুক্ত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। পরবর্তীতে বিষয়টি জানতে পেরে আবু বক্কর সিদ্দিক শিক্ষক পদের বেতন উত্তোলন বন্ধ রাখেন এবং নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

​অভিযোগের ভিত্তিতে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আক্তার ববি তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন সাকিব আহমেদ সাগর তদন্ত শেষে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় চরম অসংগতি উল্লেখ করে মোবারক হোসেনের নিয়োগ অবৈধ বলে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এমনকি তৎকালীন নিয়োগ কমিটিতে নাম থাকা কর্মকর্তারাও তাঁদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছিল বলে লিখিতভাবে নিশ্চিত করেন।

​আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে চলতি ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে মোবারক হোসেনের এমপিও আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করে মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর।

​ভুক্তভোগী কর্মচারী আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে বৈধ নিয়োগ থাকা সত্ত্বেও বেতন-ভাতা না পেয়ে আমি চরম আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। ভুয়া নিয়োগ দেখিয়ে মোবারক হোসেন বছরের পর বছর সরকারি অর্থ লুটে নিয়েছেন। আমি এই জালিয়াতির সুষ্ঠু বিচার ও সরকারি অর্থ অপব্যবহারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

​মাদরাসার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সুপার আব্দুর রশিদ জানান, মোবারক হোসেন কখনোই মাদরাসায় এসে দায়িত্ব পালন করেননি। জালিয়াতির মাধ্যমে মাদরাসায় অনুপস্থিত থেকেও তিনি দীর্ঘদিন বেতন তুলেছেন।

​সরকারি অর্থ আদায়ে মামলা করার উদ্যোগ

​অভিযোগের বিষয়ে মোবারক হোসেনের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। প্রথমে সাক্ষাতে কথা বলবেন জানালেও পরবর্তীতে ফোন রিসিভ করেননি।

​মাদরাসা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল মালেক জানান, প্রতিষ্ঠানপ্রধান জেনারেল সার্টিফিকেট মামলা করার জন্য রিকুইজিশন দিলেই অভিযুক্ত মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে। মামলার মাধ্যমে অবৈধভাবে উত্তোলিত সমুদয় সরকারি পাওনা আদায় করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।