রেজাউল করিম,ময়মনসিংহ

ময়মনসিংহের ঘাগড়া ইউনিয়নের সুহিলা এলাকায় সম্প্রতি কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত এক চোখ ধাঁধানো ‘গোপন’ অভিযানে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকার নকল সিগারেট ও সিলিং মেশিনসহ বিপুল পরিমাণ প্যাকিং সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। গত ৫ অক্টোবর সংঘটিত এই অভিযানের মূল আকর্ষணம் কেবল কোটি টাকার মালামাল উদ্ধার নয়; বরং এর নেপথ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে প্রকাশ্য ধমক, নিজের পকেটের টাকায় চাকরি বাঁচানোর অভিনব আবিষ্কার এবং অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্যদের নাম ভুলে যাওয়ার এক রুদ্ধশ্বাস থ্রিলার নাটক। যার মূল চরিত্র ময়মনসিংহের বিভাগীয় ভ্যাট কর্মকর্তা মো. ফিরোজ হোসেন বিশ্বাস।
ডিজিএফআই-এনএসআইকে বাইপাস এবং “তোদেরকে তথ্য কেন দিতে হবে?”
রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও রাজস্ব সুরক্ষায় নিয়োজিত শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই ও এনএসআই সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করে ভ্যাট বিভাগকে এই অবৈধ কারখানার সন্ধান দিয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী যৌথ অভিযান বা সমন্বয় থাকার কথা থাকলেও, ভ্যাট কর্মকর্তা ফিরোজ হোসেন বিশ্বাস সম্পূর্ণ নিজ কৃতিত্ব জাহির করতে সেই মূল তথ্যদাতা সংস্থাকে পুরোপুরি এড়িয়ে যান বা বাইপাস করেন।
পরবর্তীতে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে তিনি বিন্দুমাত্র রাখঢাক না করে উল্টো ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দেন—”তোদেরকে এই তথ্য কেন দিতে হবে?” রাষ্ট্রের একটি দায়িত্বশীল সংস্থার গোয়েন্দাদের প্রতি একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও বেপরোয়া আচরণ ময়মনসিংহের প্রশাসনিক মহলে তীব্র সমালোচনার ঝড় তুলেছে।
অভিযানের ভিডিও দেখুন👇
অভিযান হলো এসআই দিয়ে, কিন্তু পুলিশ অফিসারের নাম জানেন না ভ্যাট মহারাজ!
কোটি টাকার একটি বিশাল ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে ভ্যাট কর্মকর্তা ফিরোজ হোসেন বিশ্বাস সঙ্গে নিয়েছিলেন কোতোয়ালি থানা থেকে মাত্র একজন এএসআইকে (সহকারী উপপরিদর্শক) এবং ঘটনাস্থলে গিয়ে টহল পুলিশের আরও এক এএসআইকে পান।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সাংবাদিকরা যখন বারবার জানতে চিলেন যে এত বড় অভিযানে ভ্যাট সাহেবের সঙ্গে থাকা পুলিশ অফিসারদের নাম ও পরিচয় কী, তখন তিনি তাদের নাম বলতে পুরোপুরি ব্যর্থ হন। তিনি কেবল অসহায়ত্ব প্রকাশ করে জানান যে জব্দ তালিকায় তাদের সই আছে, কিন্তু নাম পাওয়া যাচ্ছে না বা মনে নেই! প্রথম শ্রেণীর একজন গেজেটেড কর্মকর্তা হয়ে নিজের পরিচালিত অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশের নাম বলতে না পারা বা নাম লুকিয়ে যাওয়ার এই ঘটনা পুরো অপারেশনকে এক অদ্ভুত ধোঁয়াশায় ঢেকে দিয়েছে।
পকেট থেকে লাখ টাকা খরচ, নাকি চাকরি বাঁচানোর নাটক?
অভিযানে ২৮ বস্তায় ২ লাখ ৬৪ হাজার শলাকা নেভি, ৪ বস্তায় ৩৩ হাজার ৬০০ শলাকা রয়েল, স্টার, মনসুন এবং খোলা সিগারেট মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকার মালামাল উদ্ধার হলেও—সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, ঘটনাস্থলে কোনো মালিক বা কারিগরকে পাওয়া যায়নি। তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়েছে ভ্যাট টিমকে।
পুরো ভিডিওটি দেখুন-👇
তবে অপরাধীদের কাউকেই আটক করতে না পারলেও ভ্যাট কর্মকর্তা ফিরোজ সাহেব সাংবাদিকদের শোনান এক রূপকথার গল্প। তাঁর দাবি, এই গোপন তথ্য জোগাড় করতে নাকি তাঁর নিজের পকেটের কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে! শুধু তা-ই নয়, বুক ফুলিয়ে তিনি এমন ভাব প্রকাশ করেন যে, এই পেমেন্ট বা খরচ না করলে নাকি তাঁর চাকরিটাই থাকত না! নিজ পকেটের টাকা খরচ করে চাকরি রক্ষা করার এই অভাবনীয় আবিস্কারের পর তাঁকে গোয়েন্দাগিরির জন্য কোনো বিশেষ পদক দেওয়া উচিত কি না, সেই প্রশ্ন এখন সচেতন মহলের।
মালিকহীন কারখানা ও বিভ্রান্তিকর হিসাবের মারপ্যাচ
নেভি, রয়্যাল, স্টার বা মনসুনের মতো যে নামিদামি ব্র্যান্ডগুলোর নাম ভাঙিয়ে এই অবৈধ কারখানাটি জমজমাট ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিল, সেই মূল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি বছর সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকার ভ্যাট ও রাজস্ব প্রদান করে থাকে। অথচ ভ্যাট বিভাগ পুরো বিষয়টি এতটাই গোপনীয়তা ও রহস্যের সাথে পরিচালনা করেছে যে, ক্ষতিগ্রস্ত বৈধ কোম্পানিগুলো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো সুযোগই পায়নি। এছাড়া জব্দকৃত পণ্যের আর্থিক মূল্য নিয়েও কর্মকর্তা একেক সময় একেক রকম বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন।
ভিডিও দেখুন👇
সাংবাদিকদের জেরার মুখে চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি
ঘটনার সত্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা চাইতে স্থানীয় অনুসন্ধানী সংবাদকর্মীরা ভ্যাট দপ্তরে গেলে কর্মকর্তা ফিরোজ হোসেন বিশ্বাস প্রথমে সাফ জানিয়ে দেন, এসব তথ্য গণমাধ্যমকে দেওয়ার কোনো নিয়ম তাঁদের নেই।
কিন্তু সাংবাদিকদের একের পর এক যৌক্তিক ও তথ্যভিত্তিক জেরার মুখে পড়ে তাঁর সব আত্মপক্ষ সমর্থনের বেলুন চুপসে যায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি একপর্যায়ে স্বীকার করতে বাধ্য হন—”আমি নিজেই এখন এই বিষয় নিয়ে খুব ঝামেলার মধ্যে আছি।” একই সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থার সাথে ঘটে যাওয়া বাকবিতণ্ডা ও নিজের টানাটানির কথা তিনি অকপটে মেনে নেন।