“বাদী অত্যন্ত সুকৌশলে…. মূল্যবান সম্পত্তি গ্রাস করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হইয়া….”

স্নেহাশীষ ঘোষ মিশু

​চিকিৎসা বিজ্ঞানে জটিল কোনো রোগে আক্রান্ত কোনো রুগীকে নিশ্চয়ই হাসপাতাল বলবে না—‘ডাক্তার যেভাবে অপারেশন করে, আপনিও এসে সেভাবে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে নিজের রোগীর অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন করে নিন!’ এতদিন দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর চিত্রও ছিল অনেকটা তেমনই; সাধারণ মানুষকে সেখানে শুধুই নিষ্ক্রিয় পাঠক হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু গতকাল ‘দৈনিক জাহান’-এর পাতায় শ্রদ্ধেয় সম্পাদক ও প্রকাশক শেখ মেহেদী হাসান নাদিম ভাইয়ের নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক ঘোষণাটি পড়ার পর একজন বঞ্চিত নাগরিক হিসেবে আমার বুকটা ভরে উঠেছে। সংবাদপত্রের দীর্ঘ ইতিহাসে এর আগে কোনো সম্পাদক পাঠকদের উদ্দেশ্যে এভাবে রাজকীয় ঘোষণা দিয়ে বলেননি—‘দৈনিক জাহান আমার একার সম্পত্তি নয়, এটা ময়মনসিংহবাসীর সম্পদ, আপনারা সত্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে তথ্য পাঠালে তা বিন্দুমাত্র কাটছাঁট ছাড়া অবিকল ছাপা হবে।’ তিনি পাঠকদের এক ঝটকায় ‘সাংবাদিকতার‘ সুযোগ তৈরি করে দিয়ে সাধারণ মানুষের হাতে সত্য প্রকাশের সদর ফটক খুলে দিয়েছেন!

দুই নম্বর জমি? দলিল জাল? আর মালিক ১ নম্বর!

​আমার পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গোহাইলকান্দির যে সম্পত্তিটি রয়েছে, ভুয়া মালিকদের অবৈধ দখলের কারণে ময়মনসিংহের অনেকেই হয়তো আজ সেই জমিকে ‘বিতর্কিত জমি’ বলে থাকেন। কিন্তু একটু সরলভাবে ভেবে দেখুন তো—জমি কি কখনো বিতর্কিত হতে পারে? একটা স্থির মাটি কীভাবে দুই নম্বর হয়? জমি কখনো দুই নম্বর হয় না, দলিল বা কাগজও নিজে থেকে কখনো জাল হয় না। দুই নম্বর বা জাল হচ্ছে ওই চক্রান্তকারী ও সুবিধাবাদী মানুষগুলো—যাঁরা জমি না কিনে বা কোনো বৈধ অধিকার ছাড়া অন্যায্যভাবে কাগজে নিজেদের নাম বসিয়ে ফেলে কিংবা অন্যের জমিতে বেআইনি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে নিজেদের মালিক বলে দাবি করে! গোহাইলকান্দির জমিতেও ঠিক এই জালিয়াতিই ঘটেছে। আর সম্পাদক মহোদয়ের সেই উন্মুক্ত ঘোষণার পরই এই দুই নম্বর মানুষগুলোর আসল চেহারা উন্মোচিত হয়ে গেছে। প্রমাণের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে মুখোমুখি দাঁড়ানোর এই খোলা আহ্বান পাওয়ার পর প্রবীণ শিক্ষিকা থেকে শুরু করে পুরো দখলদার গোষ্ঠী এখন সায়েন্সের স্টুডেন্ট হওয়ার অহেতুক অজুহাত বানিয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কারণ তারা ভালো করেই জানে, অন্যের জমিতে ভুয়া সাইনবোর্ড টাঙানো কিংবা ফোনে হুমকি দেওয়া সহজ, কিন্তু পত্রিকার পাতায় প্রমাণের মুখোমুখি দাঁড়ানোর কোনো আইনি কাগজ তাদের থলিতে নেই!

​আইনি লড়াইয়ের মূল ভিত্তি

​ময়মনসিংহের মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে নিজের কষ্টের কথা, কয়েক পুরুষের বঞ্চনার গল্প বলার ক্ষমতা আমার ছিল না। সম্পাদক নাদিম ভাই সত্য প্রকাশের সেই উন্মুক্ত মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আজ আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হৃত অধিকারের কথা বলার মতো নূন্যতম আইনি ভিত্তিও আমার থাকত না—যদি না ২০১১ সালে ময়মনসিংহের দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতের বিজ্ঞ বিচারক জনাব মোঃ জহিরুল কবীর সেই ঐতিহাসিক রায়টি প্রদান করতেন!

​বিচারকের ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ ও রায়

​সেদিন দেওয়ানি আদালতের বিচারে আমার বা আমার পরিবারের কোনো সদস্যের উপস্থিতিই ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞ বিচারক কোনো প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার না করে, নিজস্ব বিচারে নথিপত্র পরীক্ষা করে চক্রান্তের মুখোশ খুলে দিয়েছিলেন। বিজ্ঞ বিচারক তাঁর রায়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় লিখে গিয়েছিলেন—“বাদী অত্যন্ত সুকৌশলে মূল জিনিস এড়াইয়া সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন মূল্যবান সম্পত্তি গ্রাস করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হইয়া বিভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিয়াছেন”। সেদিন বিচারক যদি এই সাহসী রায়টি না দিতেন, তবে চক্রান্তকারীদের ভিড়ে আইচ পরিবারের শেষ বংশধর হিসেবে আজ আমার কথা বলার মতো একটু জমিও অবশিষ্ট থাকত না।

​চার দশকের বঞ্চনা ও হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ

​বিগত চার দশক ধরে এই চক্রান্তকারীরা আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় পূর্বপুরুষদের রক্তের ঘামে গড়া ভিটেমাটি আর স্মৃতিগুলোকে মুছে দিয়ে আমাদের নিঃস্ব বানিয়ে পথে বসিয়ে দিয়েছিল। যখনই আমি আইনিভাবে নিজের ন্যায্য উত্তরাধিকার নিয়ে আদালতে হাজির হয়েছি, তখনই তারা বেছে নিয়েছে আদালতের পেছনের দরজা দিয়ে মামলা প্রত্যাহারের নতুন নাটক। আমাকে ও আমার আইনজীবীকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে, তড়িঘড়ি করে জজ কোর্ট থেকে মামলা তুলে নেওয়ার চক্রান্ত করা হয়েছিল। কিন্তু মহামান্য হাইকোর্ট আবার সেই চক্রান্তের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়ে সত্যের জয় সুনিশ্চিত করেছেন।

​প্রমাণের শক্তিতে সত্যের চূড়ান্ত জয়

​আমরা সাধারণ মানুষ। শত শত দলিলের হিসাব আর আইনি খতিয়ানের জটিল প্যাঁচ আমরা বিজ্ঞ আদালতের কাঠগড়াতেই প্রমাণ করব। সেই জটিল লড়াইটি হবে আদালতের চূড়ান্ত ময়দানে, কিন্তু তার আগে ‘দৈনিক জাহান’-এর এই মুক্তমঞ্চের মাধ্যমে ময়মনসিংহের সাধারণ মানুষের বিচারালয়ে আজ আমরা সত্য প্রকাশের সুযোগ পেলাম। ২০১১ সালের সেই ঐতিহাসিক বিচারিক রায় আর সম্পাদক শেখ মেহেদী হাসান নাদিম ভাইয়ের সাহসই আমার প্রধান শক্তি। ময়মনসিংহবাসীকে শুধু এটুকুই বলতে চাই—ভীতি, হুমকি বা খোঁড়া অজুহাতে সত্যকে চিরকাল চেপে রাখা যায় না; প্রমাণের শক্তিতেই সত্যের চূড়ান্ত জয় হবে।