ভিটেমাটি হারানোর মনস্তত্ত্ব ও শেকড়ছেঁড়ার ইতিহাস – (৩য় পর্ব)

​উচ্ছেদের নৃশংস চক্রান্ত ও লুটপাটের ঘৃণ্য উত্তরাধিকার

শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

​একটি আভিজাত্যপূর্ণ, বিত্তশালী ও শতাব্দীপ্রাচীন পরিবার কেবল গুজবে কান দিয়ে হুট করে নিজের পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে সীমান্তে পালিয়ে যায় না। তাঁদের পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল এমন এক পরিকল্পিত, নরকতুল্য ও নৃশংস পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে প্রতিদিনের টিকে থাকাটাই হয়ে উঠেছিল একেকটি জীবন্ত আতঙ্ক।

​আজ প্রশ্ন তোলা দরকার—কারা তৈরি করেছিল সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ? কীভাবে রাতারাতি একদল লোলুপ প্রতিবেশী ও স্থানীয় উগ্র মাস্তান বাহিনী পুরো জনপদের শাসনভার নিজের হাতে তুলে নিয়েছিল? উচ্ছেদের এই ইতিহাস কোনো অলৌকিক বিপর্যয় নয়; এটি ছিল সুনির্দিষ্ট কিছু মানুষের হিংস্র লোভ, সামাজিক অপরাধ এবং ঘৃণ্য ক্ষমতার দম্ভের সরাসরি ফলাফল।

​কীভাবে তৈরি হয়েছিল সেই নরকতুল্য আতঙ্ক?

​সংখ্যালঘু পরিবারগুলোকে গৃহহীন করার প্রক্রিয়াটি একদিনে সম্পন্ন হয়নি। স্থানীয় লোভী রাজনৈতিক সুবিধাবাদী এবং সদ্য জন্ম নেওয়া মাস্তান চক্র মিলে এক সুনির্দিষ্ট নীল নকশা বাস্তবায়ন করেছিল:

  • ​ধারাবাহিক মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন: রাতের আঁধারে জমিদার বা বর্ধিষ্ণু বাড়ির সিংহদরজায় পাথর মারা, রাতের বেলা মেঠোপথে হেঁটে যাওয়ার সময় উসকানিমূলক গালিগালাজ করা, মন্দিরে হামলা বা বিগ্রহ ভাঙচুর করা ছিল প্রতিদিনের ঘটনা। প্রতিটি সূর্যাস্তের পর সেই পরিবারগুলোর অন্দরমহলে নেমে আসত এক হিমশীতল নীরবতা—কখন কোন দিক থেকে আক্রমণ আসে, সেই আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে থাকত পুরো পরিবার।
  • ​নারী ও শিশুর নিরাপত্তাকে জিম্মি করা: মাস্তান বাহিনী খুব ভালো করেই জানত, সম্ভ্রান্ত পরিবারের দুর্বলতম জায়গাটি কোথায়। পুকুরঘাটে বা হাটে-বাজারে যাওয়ার পথে ঘরের নারী ও মেয়েদের উদ্দেশ্য করে কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত, সরাসরি হুমকির মহড়া এবং সামাজিক সম্মান ধূলিসাৎ করে দেওয়ার মানসিক চাপ দেওয়া হতো। যখন কোনো গৃহকর্তা উপলব্ধি করতেন যে তাঁর অর্থ, জমি বা সামাজিক প্রতিষ্ঠা তাঁর ঘরের মেয়ে বা স্ত্রীর সম্ভ্রম রক্ষা করতে পারছে না—তখনই তাঁর মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ ভেঙে পড়ত।
  • ​সামাজিক বয়কট ও আইনি পক্ষাঘাত: থানায় গেলে পুলিশ কর্মকর্তা মুখের ওপর বলে দিত, “পরিস্থিতি ভালো না, আপনারা কিছুদিন বাইরে কোথাও গিয়ে থাকেন।” প্রতিবেশী হিসেবে এতদিন যারা মিষ্টির থালা নিয়ে ঘরে আসত, তারা হঠাৎ চোখ ঘুরিয়ে ফেলে বলত, “মাথা গরম কইরেন না, জমিজমা বেচাকেনা কইরা পলাইয়া বাঁচেন।” চারপাশের এই নীরব সম্মতি এবং প্রশাসনের প্রকাশ্য পক্ষাঘাতই উচ্ছেদের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।

​যারা তাড়িয়েছিল, সম্পদ কি তবে তাদের হাতেই গেল?

​ইতিহাসের সবচেয়ে নগ্ন ও ঘৃণ্য সত্য হলো—যারা সেদিন রক্তচক্ষু দেখিয়ে, মধ্যরাতে হুমকি দিয়ে এবং পৈশাচিক পরিবেশ তৈরি করে এই পরিবারগুলোকে ভিটেমাটি ছেড়ে একবস্ত্রে পালাতে বাধ্য করেছিল, পরবর্তীতে সেই ফেলে যাওয়া বিপুল ধন-সম্পদ, দালানকোঠা ও বিস্তৃত ভূসম্পত্তির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ঠিক সেই মাস্তান ও প্রভাবশালী চক্রটির হাতেই।

  • ​পৈশাচিক ক্ষমতার উত্থান: যারা এতদিন অভিজাত পরিবারগুলোর ছায়ায় সাধারণ মানুষ হয়ে বাস করত বা ছোটখাটো সুযোগ-সুবিধার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরত, তারা রাতারাতি নিজেদের ‘মোড়ল’, ‘রাজনৈতিক নেতা’ বা ‘ভূমিপতি’ হিসেবে জাহির করতে শুরু করল। ভয় দেখিয়ে উচ্ছেদ করার সেই প্রাথমিক অপরাধই তাদের সমাজে নতুন প্রভাবশালী বানিয়ে দিয়েছিল।
  • ​লুটপাটের চরম উল্লাস: বাস্তুচ্যুত পরিবারটি যখন সীমানা পার হওয়ার জন্য অন্ধকারে কাঁদা-জল পেরিয়ে চোখের জল ফেলছিল, তখন এই গুণ্ডাবাহিনী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা সেই পরিবারের তালাভাঙা ঘরে ঢুকে সিন্দুক লুট করছিল। ধানের গোলা কেটে নিয়ে যাওয়া, পুকুরের মাছ সেঁচে তুলে নেওয়া এবং পারিবারিক দুর্লভ জিনিসপত্র ভাগবাটোয়ারা করার সেই দৃশ্য কোনো সভ্য সমাজের নজির হতে পারে না—তা ছিল এক খাঁটি আদিম লুণ্ঠন।

​অপরাধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ‘আজকের প্রভাবশালী’ সমাজ

​পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালের শত্রু সম্পত্তি আইন কিংবা অর্পিত সম্পত্তি আইনের বৈষম্যমূলক কাঠামো এসে এই মাস্তান চক্রের অবৈধ দখলদারিত্বকে কেবল কাগজে-কলমে আইনি প্রলেপ দিয়েছিল। কিন্তু মূল বাস্তবতাটি রয়ে গেল অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ: আজকের সমাজে ময়মনসিংহের মতো এলাকায় যে পরিবারগুলো আভিজাত্যের ভং ধরে বিশাল সম্পত্তির মালিক হিসেবে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তাদের অনেকেরই সেই সম্পদের আদি উৎস হলো কোনো অসহায় পরিবারের কান্না, রাতারাতি ঘরছাড়ার দীর্ঘশ্বাস এবং গায়ের জোরে ছিনিয়ে নেওয়া পৈতৃক জমি।

​এই নৃশংস অন্যায়ের ইতিহাসকে আজ আর কোনো কৌশলী বা মিষ্ট ভাষায় ঢেকে রাখার সুযোগ নেই। যারা সেদিন গুণ্ডামি করে, ভয় দেখিয়ে এবং অপরাধমূলক পরিবেশ তৈরি করে একটি বর্ধিষ্ণু সম্প্রদায়কে উচ্ছেদ করেছিল, তারা এবং তাদের পরবর্তী উত্তরসূরিরা ইতিহাসের কাঠগড়ায় সরাসরি ‘জবরদখলকারী’ ও ‘অপরাধী’ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

​(চলবে… চতুর্থ পর্ব : জাল দলিলের মহাকাব্য ও প্রশাসনিক কারসাজি: গোহাইলকান্দির আইচ পরিবারের বিচারিক লড়াই)